বিডি ক্রাইম ডেস্ক, বরিশাল॥ বর্ষা এলেই বরিশালের আগৈলঝাড়ার বিলাঞ্চল বদলে যায়। চারদিকে শুধু পানি আর পানি।
যে জমিতে কয়েক মাস আগেও কৃষকের ব্যস্ততা ছিল, সেই জমিই বর্ষায় তলিয়ে যায় পানির নিচে। কমে আসে কৃষিকাজ, থেমে যায় অনেকের নিয়মিত আয়।
সেই পানির বুকেই ফুটে ওঠে নতুন সম্ভাবনা। বিল-ঝিল, খাল-বাঁওড় আর পানিতে ডুবে থাকা জমিতে জন্ম নেওয়া শাপলা এখন হয়ে উঠেছে বহু পরিবারের বিকল্প আয়ের পথ।
ভোরের আলো ফোটার আগেই নৌকা নিয়ে বিলে নেমে পড়েন সংগ্রহকারীরা। পানির মধ্যে ঘুরে ঘুরে শাপলা সংগ্রহ করেন তারা।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রমের পর নৌকা ভর্তি শাপলা নিয়ে ফিরেন স্থানীয় বাজারে। সেখানে অপেক্ষায় থাকেন পাইকাররা।
এভাবেই আগৈলঝাড়ায় বর্ষাকালকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শাপলাকে কেন্দ্র করে ছোট্ট এক অর্থনৈতিক চক্র।
কেউ শাপলা সংগ্রহ করছেন, কেউ পাইকারি কিনছেন, আবার কেউ ভ্যান নিয়ে ছুটছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। কেউ সরাসরি বাজারে বসে বিক্রি করছেন।
উপজেলার চেংগুটিয়া-চৌদ্দমেদা বিলসহ বিভিন্ন বিল ও জলাবদ্ধ কৃষিজমিতে এখন শাপলা সংগ্রহের ব্যস্ততা। রাজিহার, গৈলা, বাকাল, বাগধা ও রত্নপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার মানুষ বর্ষার কয়েক মাস এই মৌসুমি পেশার সঙ্গে যুক্ত হন।
শাপলা সংগ্রহকারী মো. শাহআলমের দিন শুরু হয় ভোরে। নৌকা নিয়ে চলে যান চেংগুটিয়া-চৌদ্দমেদা বিলে।
তিনি বলেন, বর্ষায় কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে থাকায় কৃষিকাজ থাকে না। তাই এই সময় শাপলা সংগ্রহ করেন। দিনে ২০০ থেকে ৪০০ মুঠা পর্যন্ত শাপলা সংগ্রহ করতে পারেন তিনি।
কাজটি সহজ নয়। কোমর বা বুকসমান পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকা চালিয়ে শাপলা তুলতে হয়। এরপর সেগুলো গুছিয়ে নিয়ে যেতে হয় পাইকারের কাছে। কিন্তু কষ্টের এই কাজটিই বর্ষায় অনেক পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে আয়ের অন্যতম অবলম্বন।
সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে পাইকাররা প্রতি মুঠা শাপলা প্রায় ৫ টাকা দরে কিনে নেন। এরপর সেগুলো ভ্যানযোগে নিয়ে যান বিভিন্ন হাট-বাজার কিংবা আশপাশের গ্রামগুলোতে।
পাইকার অসিম মন্ডল বলেন, সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে ৫ টাকা দরে শাপলা কিনে পরে ১০ টাকা করে বিক্রি করেন। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ মুঠা পর্যন্ত বিক্রি হয়। খরচ বাদ দিয়েও ভালো আয় থাকে।
অর্থাৎ বিলের পানিতে বিনা পুঁজিতে সংগ্রহ করা শাপলা এক হাত থেকে আরেক হাতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি করছে আয়ের নতুন সুযোগ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমে একজন সংগ্রহকারী প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ মুঠা শাপলা তুলতে পারেন। ভালো দিনে কারও কারও আয় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়। অন্যদিকে শাপলার পাইকারি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্তদের দৈনিক বিক্রি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
শাপলা সংগ্রহকারী মজিবুর রহমান বছরের প্রায় চার মাস এই কাজ করেন। তার কাছে বর্ষার শাপলা শুধু একটি জলজ ফুল নয়, সংসার চালানোর অবলম্বন।
তিনি বলেন, এ সময় জমিতে কাজ থাকে না। শাপলা তুলে বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ চালান। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই কাজে আলাদা কোনো পুঁজির প্রয়োজন হয় না।
মজিবুরের মতো অনেকের কাছেই তাই বর্ষার শাপলা হয়ে উঠেছে ‘চার মাসের ভরসা’।
শাপলা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের অতি পরিচিত একটি ফুল। তবে আগৈলঝাড়ার মানুষের কাছে বর্ষায় এর গুরুত্ব আরও বেশি। শাপলার ডাটা দিয়ে রান্না করা তরকারি গ্রামবাংলার পরিচিত খাবার। এখন শহরাঞ্চলেও এর চাহিদা বাড়ছে।
প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শাপলা সংগ্রহ করতে কৃষকের আলাদা করে জমি প্রস্তুত করতে হয় না, বীজ কিনতে হয় না কিংবা সার-কীটনাশকেও খরচ করতে হয় না। ফলে বর্ষায় পানিতে তলিয়ে থাকা জমি থেকেই বিনা বিনিয়োগে পাওয়া যাচ্ছে এই পণ্য।
স্থানীয় সূত্র বলছে, আষাঢ় থেকে ভাদ্র-সাধারণত তিন থেকে চার মাস শাপলার মৌসুম। ধান, পাট কিংবা ধঞ্চের পানিতে ডুবে থাকা জমি ছাড়াও খাল-বিল, পুকুর ও ডোবায় প্রচুর শাপলা জন্মে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনীতি কুমার সাহা বলেন, শাপলা প্রচলিত কৃষিপণ্যের আওতাভুক্ত নয়। এটি মূলত কৃষিজমি, পুকুর, ডোবা ও বিভিন্ন জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। শাপলা কিছুটা বেশি সময় সংরক্ষণ করার বিষয়েও স্থানীয়দের পরামর্শ দেওয়া হয়।
বর্ষা তাই আগৈলঝাড়ার মানুষের কাছে শুধু জলাবদ্ধতা কিংবা কর্মহীনতার গল্প নয়। সেই পানির বুকেই ফুটে থাকা শাপলা অনেক পরিবারের ঘরে নিয়ে আসে উপার্জনের টাকা।
একদিকে বিলের পানিতে নৌকা ভাসিয়ে শাপলা তুলছেন সংগ্রহকারীরা, অন্যদিকে সেই শাপলা নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন পাইকাররা। বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে বর্ষার এই প্রাকৃতিক সম্পদ।
পানির নিচে হারিয়ে যাওয়া কৃষিজমি যখন সাময়িকভাবে কর্মহীন করে দেয় মানুষকে, তখন সেই পানিতেই ফুটে থাকা শাপলা যেন নতুন করে বলে, প্রকৃতি শুধু কেড়ে নেয় না, কখনো কখনো বাঁচার পথও দেখায়।