• ৭ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৩শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৩শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

বরিশালে মিলছে না বড় ইলিশ

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত আগস্ট ৭, ২০২৬, ১৯:০৫ অপরাহ্ণ
বরিশালে মিলছে না বড় ইলিশ

বিডি ক্রাইম ডেস্ক, বরিশাল॥ ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনচক্র সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নির্বিচারে ধরা পড়ছে। যার কারণে নদী ও সাগরে বড় আকারের ইলিশের দেখা মিলছে না।

একইসঙ্গে ভরা মৌসুমে ইলিশ সংকটও দেখা দেওয়ায় দাম কমছে না। বরিশাল নগরের পোর্ট বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বড় সাইজের ইলিশ নেই।

সর্বোচ্চ এক কেজি দুইশ গ্রাম সাইজের কিছু মাছ রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছর থেকে বাজারে আগের মতো বড় সাইজের ইলিশ আসা কমে গেছে।

বর্তমানে বাজারে দেড় কেজি সাইজের মাছ আসে না। এক কেজি দুইশ গ্রাম সাইজের মাছ দিনে পাঁচ থেকে ১০টির বেশি আসে না।
বরিশালের মেঘনা নদীর জেলে মোতালেব বেপারী বলেন, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করছেন। আগে নদীতে প্রায়ই দেড় কেজি থেকে দুই কেজি ওজনের ইলিশ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন কেজি থেকে ৮০০/৯০০ গ্রাম সাইজের মাছ কালেভদ্রে পাওয়া যায়। নদীতে ইলিশ মাছ তেমন একটা নেই। ৪০০/৫০০ গ্রাম ওজনের কিছু মাছ পাওয়া যায়।

পোর্ট রোড বাজারে শুক্রবার ১২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ৩০০০, এক কেজি সাইজ ২৮০০, ৯০০ গ্রাম ২৬০০, আধা কেজি ওজনের ইলিশ ২২৫০, ৪০০ গ্রাম ওজনের ১৭৫০ টাকা ও ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ বিষয়ে বরিশালের হিজলা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম বলেন, একটি ইলিশের এক থেকে দেড় কেজি ওজনের হতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগে। নদীতে ডিম ফুটে জাটকা জন্ম নেওয়ার পর তা কিছুদিন মিঠাপানিতে বেড়ে সাগরে চলে যায়। সেখানে আরও বড় হয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজন হলে ডিম ছাড়তে আবার নদীতে ফিরে আসে। ডিম দেওয়ার পর পুনরায় সাগরে গিয়ে পরিপক্ব হয়ে আবার নদীতে ফিরে আসে। কিন্তু এই পুরো জীবনচক্র সম্পন্ন করার আগেই অধিকাংশ মাছ ধরা পড়ে।

তিনি আরও বলেন, নদীতে জাটকা শিকার, সাগর মোহনায় ট্রলারে নির্বিচার মাছ ধরা এবং নদী-সাগর যাতায়াতের পথেও ব্যাপক শিকারের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বড় আকারের ইলিশের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং সামগ্রিক উৎপাদনেও প্রভাব পড়ছে।

মোহাম্মদ আলম বলেন, দেশের জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় মাছের চাহিদাও বেশি। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক জেলে জীবিকার তাগিদে নিষিদ্ধ সময়েও নদীতে মাছ ধরছেন। বর্তমানে নদীতে মাছের পরিমাণ কম হলেও শত শত নৌকা ও জাল নিয়ে জেলেরা নদীতে অবস্থান করছেন। তাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, জেলেদের জন্য সরকারের প্রণোদনা কার্যক্রমেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দীর্ঘ ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ না হওয়ায় অনেক প্রকৃত জেলে সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রণোদনা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। তার দাবি, হালনাগাদ তালিকা না থাকায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ প্রকৃত জেলে সরকারি প্রণোদনা পান না।

বরিশাল জেলা মৎস্য দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভাগে ইলিশ উৎপাদন গত তিন অর্থবছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন উৎপাদনের পর থেকে প্রতিবছরই উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে এসেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ দশমিক ১৫ টনে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩০১ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫১ টনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টনে পৌঁছালেও পরবর্তী বছরগুলোতে নিম্নমুখী ধারা শুরু হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ দশমিক ১৫ টনে নেমে আসে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ উৎপাদনের বছর ২০২২-২৩ এর তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন, যা প্রায় ২৮ শতাংশ হ্রাসের সমান। এই ধারাবাহিক পতন দেশের মৎস্য খাত ও ইলিশনির্ভর অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।