বিডি ক্রাইম ডেস্ক ॥
বরিশালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এখন পর্যন্ত আতংকিত হওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি না হলেও বরিশাল শেরে-বাংলা মেডিকেলে চলতি মাসে ভর্তি হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত ২৫ জন রোগী। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গত ১৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত বরিশালে ৪২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৭জন।ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় হাসপাতালে সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের চিকিৎসক।
ঢাকা কেন্দ্রিক যাতায়াতের কারণে বরিশালেও ডেঙ্গুরপ্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে এই রোগের প্রাথমিক উপসর্গ দেখামাত্র চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শেরে-ই বাংলা মেডিকেলের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, বরিশালে এর আগে ডেঙ্গুর তেমন প্রাদুর্ভাব ছিলো না ।
গত জুনমাসে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করতে ঢাকায় গিয়ে কোচিং শেষ না করেই জ্বর নিয়েবরিশাল ফিরে আসেন নগরীর ঝাউতলা এলাকার রিফাতুল ইসলাম।
বরিশালে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার শরীরে ডেঙ্গুর উপস্থিতি পাওয়ায় দ্রুত তাকে ভর্তি করা হয়শেরে-ই বাংলা মেডিকেলে।
প্রায় দুই সপ্তাহের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যানরিফাতুল।জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত আর কোন রোগী ভর্তি হয়নি শেরে-ই বাংলা মেডিকেলে।
কিন্তু গত১৬ জুলাই থেকে একে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হতে শুরু করে শেরে-ই বাংলা মেডিকেলে।গতকাল পর্যন্ত চলতি মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত ২৬ জন রোগী। যাদের বেশীর ভাগই ঢাকা থেকে জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তরা জানিয়েছেন, শরীর ও মাথা ব্যাথা, জ্বর এবং বমি বমি ভাব হচ্ছে তাদের।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. স্বপন কুমার সরকার জানান, ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা রয়েছে শেরে-ই বাংলা মেডিকেল। দেওয়া হচ্ছেসব ধরনের ওষুধপত্র, এমনকি মশারীও।
এদিকে বরিশালে আগে ডেঙ্গুর উপস্থিতি না থাকলেও ঢাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তরা বরিশালে ফিরে আসায় এবং ঢাকা থেকে বরিশালগামী লঞ্চে এডিস মশা বরিশালে আসায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন শেরে-ই বাংলা মেডিকেলের পরিচালকডা. মো. বাকির হোসেন।
এই রোগ প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা সহরোগের প্রাথমিক উপসর্গ দেখামাত্র চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।এদিকে বরগুনায় ১০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।
বরগুনা জেনারেলহাসপাতালের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হিসেবে শনাক্তকরেন। আক্রান্তদের মধ্যে চারজন বর্তমানে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীনরয়েছে।
এরা হলেন- সদর উপজেলার বাওলকর এলাকার আছিয়া বেগম, দক্ষিণ মনসাতলী এলাকার নাইম ও সবুজ এবং কদমতলা এলাকার হালিমা।বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ জুন বরগুনার ক্রোক এলাকার সাদেক, ২২ জুন পিটিআই এলাকার সাইফুল্লাহ এবং ২৩ জুন হেউলিবুনিয়া এলাকার রাব্বি জ্বরেআক্রান্ত হয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন।
পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাদের ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেহাসপাতালে ভর্তি করেন।
কিন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের অবস্থার অবনতি হওয়ায় ১০ জুন সাদেককে এবং ২৪ জুনসাইফুল্লাহ ও রাব্বিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজহাসপাতালে পাঠানো হয়।
এছাড়া গত ১২ জুন কড়ইতলা এলাকার ফোরকান হাওলাদার, ১৭ জুনখাকবুনিয়া এলাকার আল-আমীন এবং ২৩ জুন বদনিখালী এলাকার অসীম কুমার মন্ডল জ্বরেআক্রান্ত হয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন।
পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাদের ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানালে তারাতিনজনই বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা না নিয়ে অন্যত্র চলে যান।ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নাইম বলেন, তিনিঢাকা থাকেন। কয়েকদিন হলো বাড়িতে এসছেন।
বাড়িতে আসার পর তিনি জ্বরে আক্রান্তহলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা তাকেডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানান।
বর্তমানে তিনি এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সদর উপজেলার কদমতলা হালিমা বেগম বলেন, তিনি বাড়িতেই থাকেন। সম্প্রতি তিনিকোথাও বেড়াতেও যাননি।
হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেএলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা তাকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানান।তখনই তিনি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হন।
একই কথা বলেন বাওলকর এলাকারআছিয়া বেগম।বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. কামরুল আজাদ বলেন, বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ১০ জনকে আমরা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করেছি।
এদের মধ্যে ছয়জন অতি সম্প্রতি ঢাকা থেকে বরগুনা ফিরেছেন।এদিকে পটুয়াখালীতে প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত ১৬ জুলাই থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ১২ দিনে পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ জন ডেঙ্গু রোগী।
তারা হলেন- সদর উপজেলার ভুড়িয়া এলাকার সুভাষ বিশ্বাসের ছেলে সুব্রত বিশ্বাস (১৮),জৈনকাঠী এলাকার মোতালেব হাওলাদারের ছেলে রিয়াজ (২০), মৌকরন এলাকার আবুলকাশেমের ছেলে সোহাগ কবির (৩৪), দুমকী উপজেলার কাঞ্চন প্যাদার ছেলে দেলোয়ার(৪০), বাউফলের কার্তিক পাশা এলাকার আব্দুল মান্নান শরীফের ছেলে এনামুল হক (৪৪),বাউফলের ভায়লা এলাকার রহিম খানের ছেলে সিদ্দিকুর রহমান (৫৫), শহরের কলাতলাএলাকার আবুল কালাম ফকিরের ছেলে রাকিবুল হাসান (২৭)।
এছাড়া ঢাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আসেন সদর উপজেলার ইটবাড়িয়া এলাকার খালেকপ্যাদার স্ত্রী আম্বিয়া বেগম (৬০) এবং টাউন কালিকাপুর এলাকার চেরাগ আলী আকনের ছেলে আনিসুর রহমান (৫৫)।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আম্বিয়া বেগম বলেন, তিনি ঢাকা বেড়াতে গিয়ে ছিলেন।সেখানে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে পটুয়াখালী আসেন।
পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সাইদুজ্জামান বলেন, প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। এ রোগ নির্মূলে কোনো টিকা নেই, তাই এক্ষেত্রে জনসচেতনতার বিকল্প নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্তরোগীদের জন্য নেই কোনো আলাদা সেল। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গেই রাখাহচ্ছে তাদের। বেড না থাকায় অনেক রোগী মেঝেতে শুয়েই চিকিৎসা নিচ্ছেন।ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু আক্রান্ত সুব্রত বিশ্বাস বলেন, তিনি করিম মৃধাকলেজের শিক্ষার্থী।
হঠাৎ জ্বর হওয়ায় চিকিৎসকের কাছে যান। রক্ত পরীক্ষা করে তিনিবলেছেন ডেঙ্গু হয়েছে। তাই চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি।হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. অনিন্দ দাস গুপ্ত বলেন, ডেঙ্গু হলে সবধরনের ব্যাথার ওষুধ বন্ধ। এ রোগের মূল চিকিৎসা পানি। এখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদেরআমরা স্যালাইন দেই ও মশারির মধ্যে রাখি। যাতে নতুন করে অন্য কাউকে ডেঙ্গু মশাকামড়াতে না পারে।
এ পর্যন্ত এই হাসপাতালে মোট ১০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে রক্তের তিনটি পরীক্ষার প্রয়োজন হয়।
এরমধ্যে সিবিসি ও প্লাটিলেট পরীক্ষার ব্যবস্থা এ হাসপাতালে আছে। কিন্তু কিট এবংরিএজেন্ট সরবরাহ না থাকায় এনএসওয়ান পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। রোগীরা এটিবিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে করাচ্ছেন।