• ১১ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ১৯শে জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

জাতীয় মৎস্য পুরস্কার পাচ্ছে ‘ইলিশ রক্ষায় বেতাগী স্বেচ্ছাসেবক মডেল’

admin
প্রকাশিত জুলাই ১৭, ২০১৯, ১৬:৫৭ অপরাহ্ণ
জাতীয় মৎস্য পুরস্কার পাচ্ছে ‘ইলিশ রক্ষায় বেতাগী স্বেচ্ছাসেবক মডেল’

স্বপন কুমার ঢালী, বেতাগী প্রতিনিধি ॥ ১৭ জুলাই হতে ২৩ জুলাই জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ‘২০১৯ উদযাপন হচ্ছে। এ উপলক্ষে জাতীয় মৎস্য পুরস্কার পাচ্ছে ‘ইলিশ রক্ষায় বেতাগী স্বেচ্ছাসেবক মডেল’। মৎস্য সম্পদের সংরক্ষন, উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণ কাজে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরুপ আজ ১৮ জুলাই দেশে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় এর উদ্ভাবকের নিকট রৌপ্যপদক পুরস্কার প্রদান করবেন বলে জানা গেছে।

‘আমাদের সম্পদ, আমাদের দায়িত্ব ’ – এ শ্লোগান ধারন করে উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগীতে ইলিশ রক্ষায় কমিউনিটি ভিত্তিক কাজ করে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা । ব্যক্তি স্বার্থে নয়, জাতীয় স্বার্থে স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে কাজ করে জাতীয় সম্পদ ইলিশের উন্নয়নে অবদান রাখছে এসব স্বেচ্ছাসেবকরা । যা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সাড়া ফেলেছে দেশে।

জানা গেছে, মৎস সম্পদে উপকূলীয় এ উপজেলায় এককভাবে ইলিশের অবদান সরচেয়ে বেশি কিন্ত কিছু অসাধু ব্যক্তি নিষেধাজ্ঞা না মেনে অবৈধ জালের ব্যবহার করে ইলিশের ব্যপক ক্ষতি সাধন করছে। উপজেলার বিবিচিনি থেকে ফুলঝুড়ি ৪২ কিলোমিটার বিষখালী নদী পথে মৎস্য বিভাগের জনবল স্বল্পতায় তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ফলপ্রসু হয়না সরকারি উদ্যোগ। এ প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে উপজেলা মৎস অফিস স্থানীয়ভাবে ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত করে। ব্যক্তি স্বার্থে নয়, জাতীয় স্বার্থে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করে জাতীয় সম্পদ ইলিশের উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে এসব স্বেচ্ছাসেবকরা ।

বেতাগী উপজেলা মৎস কর্মকর্তা মোস্তফা আল-রাজীব জানান, ‘স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতার ফলে অভিযান চলাকালীন যে কোন সময় যে কোন স্থানে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ নদীতে নামলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেওয়া সহজতর হয়েছে। নদীতে অভিযান চালিয়ে জেলে- জাল আটক, জেল-জরিমানার আগে-ভাগে আইন প্রয়োগ নয়, এর চেয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সচেতনতাবোধ তৈরি করে অবৈধভাবে মাছ ধরা থেকে জেলেদের বিরত রাখতে পারাটা বেশি কার্যকরি এবং এর মাধ্যমে প্রমানিত হয়েছে স্থানীয় মানুষ তারা নিজেরাই কমিউনিটির সম্পদ রক্ষা করতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়টি পুরস্কারের বিচেনায় এনেছে।’

স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতার কারনে জেলেদের আইন সম্পর্কে অবহিত করন, আগাম সরকারি বার্তা পৌছানো, সরকারি আইনের বাস্তবায়ন ও নদীতে পাহারাা প্রদানে সহযোগিতা এবং জেলেরা নদীতে না নামায় এবারে জালে প্রচুর ইলিশ মাছ ধরা পড়েছে। পাশাপাশি তারা নিজেরাও প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তিতে পরিনত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্যমতে স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকার কারনে ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম অত্যন্ত সফল হয়েছে। অবৈধ জাল উচ্ছেদ ও জাটকা রক্ষা কর্মসূচিতেও স্বেচ্ছাসেবকরা সারা বছর সমানভাবে কাজ করছে। বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ‘ইলিশ রক্ষা কার্যক্রমে বেতাগী মডেল’ উদাহারণ তৈরি করছে। ফলে ইলিশ রক্ষায় এ উপজেলা এগিয়ে রয়েছে।’

‘ ইলিশ রক্ষায় বেতাগী মডেল’ কাজ শুরুর আগে একদিকে অভিযান শুরু হলে অন্যদিক অনিরাপদ হয়ে পড়ত। আর এখন স্বেচ্ছাসেবকদল থাকায় নদীতে নামার কেউ সাহস দেখায় না, অভিযান শুরু হলেই বিভিন্ন স্থানে খবর পৌছে যেত এবং সকলেই সতর্ক হয়ে যেত বর্তমানে নিষিদ্ধ সময় দিনে-রাতে সবসময় স্বেচ্ছাসেবকদের পাহারা থাকায় কেউ আইনভঙ্গ করার সাহস পায়না। প্রায়শই জেলেরা নিষিদ্ধ সময় আইনভঙ্গ করে ইলিশ নিধন করত তবে এখন আইন মানার ক্ষেত্রে জেলেদের প্রায় শতভাগ সফলতা এসেছে। মা ইলিশ সংরক্ষন অভিযানের সময় বিভিন্ন জায়গায় জেলেদের ইলিশ নিধন চলত কিন্ত এখন মা ইলিশ সংরক্ষন অভিযানকালীন ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারছে।

স্বেচ্ছাসেবক মো. শহীদুল ইসলাম হিরু তার প্রতিক্রয়ায় বলেন, নদীর মানুষ হিসেবে ইলিশ সম্পদ রক্ষার কাজে সম্পৃত্ত হয়ে আমরা অত্যন্ত খুশি। দেশের স্বার্থে সকলেরই এগিয়ে আসা উচিত। উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুর রব জানান, তবে কাজে তাদের রয়েছে নানা সংকট। লাইট, রেইন কোটর্, ছাতা, লাইফ জ্যাকেট, ভাতা প্রাপ্তি, প্রশিক্ষনের অভাব ও উচ্চ পর্যায় ‘স্বেচ্ছাসেবক’ হিসেবে স্বীকৃতির অনিশ্চয়তা। এ উদ্যোগের ফলে ফলে মৎস্য সম্পদ রক্ষায় এ উপজেলা এগিয়ে রয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক ড. মো. অলিউর রহমান বলেন, ইলিশ রক্ষায় এই স্বেচ্ছাসেবকরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্বেচ্ছাসেবকরা পারিবারিকভাবে কেউ স্বচ্ছল নয়। তার পরেও ত্যাগ স্বীকার করে সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করায় আমাদের উৎসাহের সৃষ্টি করছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রাজীব আহসান এ বিষয় বলেন, ‘ ইলিশ সম্পদ সংরক্ষন ও উন্নয়নে ‘বেতাগী মডেল’ এখন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যা মানুষকে সচেতন ও জাগ্রত করে ইলিশ রক্ষা অভিযান সফল করেছে। ফলে স্থানীয় জেলেদের মাঝে দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তণ এসেছে । জেলেরা অনেকেই এখন বুঝতে পারছে সঠিকভাবে ইলিশ সম্পদ সুরক্ষা করতে পারলে সুফল তারা নিজেরাই ভোগ করতে পারবে। ’

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সিনিয়র চীফ পোর্ট অফিসার এম হাবীবুর রহমান বলেন, ‘ইলিশ রক্ষায় এই স্বেচ্ছাসেবকরা সারাদেশে অনুকরণীয় হতে পারে। স্বেচ্ছাসেবকরা পারিবারিকভাবে কেউ স্বচ্ছল নয়। তার পরেও বিনা পারিশ্রমিকে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে এ কার্যক্রমে উৎসাহের সাথে এগিয়ে আসে। ঝাটকা রক্ষা কর্মসূচিতেও এসব স্বেচ্ছাসেবকরা অবদান রাখছে।’

জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শ্যামল চন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘আমি সরেজমিনে গিয়ে তাদের কার্যক্রম দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। ইলিশ সম্পদের উন্নয়নে ‘বেতাগী মডেল’ নি:সন্দেহে একটি কার্যকর উদ্ভাবন। যা ইলিশের বিচরণ ক্ষেত্রের অন্যান্য জেলাধীন এলাকার জন্যও সমান উপযোগী। এর সফলতা নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এটি খুবই ইতিবাচক দিক।’ জেলেরা অনেকেই এখন বুঝতে পারছে- মা ইলিশ ও জাটকা সঠিকভাবে সুরক্ষা করতে পারলে বর্ধিত হারে ইলিশ উৎপাদনের সুফল তারা নিজেরাই ভোগ করতে পারবে। এ জন্য তারা সংঘবদ্ধ হয়ে মা ইলিশ রক্ষা করছে।

এ বিষয় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান ফোরকান বলেন, ‘ইলিশ সম্পদ রক্ষায় স্থানীয়ভাবে গঠিত এই স্বেচ্ছাসেবকরা সারাদেশে উদাহরণ সৃস্টি করেছে এবং আগামীতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।’