উজিরপুর প্রতিনিধি ॥
বরিশালের উজিরপুর মডেল থানার অফিস কক্ষে প্রকাশ্যে এক বিধবা বৃদ্ধাকে নির্যাতনকারী উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিশির কুমার পাল নিজের অপকর্ম ঢাকতে ও স্থানীয় সাংবাদিকদের মুখ থামাতে টাকার মিশন নিয়ে মিডিয়া কর্মীদের কজ্বা করতে দিন রাত ব্যস্ত রয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যায় কয়েকজন সাংবাদিকদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে এবং কথিত সাংবাদিক নেতাদের তার পক্ষে নিউজ করানোর জন্য ঠিকাদারি দিয়ে মোটা অংক প্রদান করেন। এ ছাড়া অভিযোগকারী নির্যাততিা নারীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
পরে কৌশল পরিবর্তন করে ওই নারীকে লাখ টাকা দেয়ার প্রস্থাব দেন। বিনিময়ে বরিশাল পুলিশ সুপার ও বরিশালের ডিআইজির কাছে গিয়ে ওসি নির্দোষ কথাটি বলতে হবে। এর আগে নির্যাতিতা নারী বরিশাল পুলিশ সুপারের কাছে ওসির বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদান করেন।
এদিকে তদন্ত কমিটি আগামি মঙ্গলবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবেন বলে কমিটির জনৈক সদস্য জানান। নির্যাতিতা বৃদ্ধা রাশিদা বেগম রোববার দুপুর ২টার দিকে মুঠোফোনে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে গড়িয়ার পাড় এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন।
ওই বাড়ির মালিককে ম্যানেজ করে তার মাধ্যমে ওসি শিশির ও কনস্টেবল জাহিদসহ কতিপয় লোক নিয়ে তাকে (বৃদ্ধা) গড়িয়ারপাড় বাসস্ট্যান্ডের একটি ক্লাবে ডেকে নেয়। এ সময় ওসির সঙ্গে এক কাউন্সিলর, এক সাংবাদিক নেতাসহ ৪/৫ জন সরকারি দলের নেতাকর্মীকে দেখা গেছে। ওসি আমাকে অভিযোগ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে ভয়ভীতি দেখায়।
আমি আমার অবস্থানে অনড় থাকলে ওসি কৌশল পাল্টিয়ে এক পর্যায়ে আমাকে লাখ টাকা দেয়ার প্রলোভন দেখান। বিনিময়ে বরিশাল পুলিশ সুপার ও বরিশালের ডিআইজির কাছে গিয়ে ওসি নির্দোষ কথাটি বলতে হবে। ওসি শিশির তার শেখানো কথা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বলতে বলেন যে, “পুলিশ নয় জনগন মারধর করেছে”।
সে ওসির বিরুদ্ধে আরো বলেন, ওসি নিজের অপকর্ম ঢাকতে উজিরপুরে তার অনুগত সাংবাদিকদের নিয়ে গোপন বৈঠক করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার চালিয়েছে। দু’একটি মিডিয়ায় অর্থের বিনিময়ে আমার নামে মিথ্যাচার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ওসি মিডিয়ার সঙ্গে মতবিনিময় সভার নামে আমার চরিত্র হনন করেছে। আমি এরও বিচার চাই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উজিরপুরের এক সাংবাদিক জানান, শনিবার ওসি উজিরপুরের কতিপয় মিডিয়াকর্মীদের নিয়ে গোপন বৈঠকে বসে।
ওই বৈঠকে ওসি তার পক্ষে নিউজ করার জন্য একাধিক সাংবাদিক নেতাকে ঠিকাদারি দিয়ে আর্থিক লেনদেন করেন। স্থানীয়রা জানান, উজিরপুর ওসি শিশির কুমার পাল উজিরপুরে যোগদানের পরে ক্ষমতাসীনদলের কতিপয় নেতাকর্মীদের হাত করে একের পর এক বানিজ্য শুরু করে।
মাদক নির্মূলে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকলে ওসি মাসিক মাসোহারা নেয়ায় মাদকের বিস্তার ঘটে। এসব অপকর্ম যাতে প্রকাশ না হয় সেজন্য ওসি শিশির কুমার পাল উজিরপুরে তার একদল অনুগত সাংবাদিক তৈরী করে তাদের মাসিক মাসোহারা দেন।
যখনই ওসি শিশিরের বিরুদ্ধে পত্রিকায় কোন সংবাদ প্রকাশিত হয় এবং পুলিশের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ তদন্তে আসেন তখনই ওসি শিশির তার অনুগত ও মাসিক কেনা ওই কথিত সাংবাদিকদের হাজির করেন এবং ওই সংবাদ-সাংবাদিকের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেওয়ান। বিভিন্ন সময় ওসির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তখন ওসির ভরসা থাকে তার অনুগত সাংবাদিকরা।
কোন কোন সময় ওসি ওই কেনা কথিত সাংবাদিকদের নিজ খরচে বরিশাল পুলিশ সুপারের কাছে নিয়ে তার পক্ষে ওকালতি করান। নানা অপকর্মের পরে এভাবে দাপটের সঙ্গে টিকে আছেন ওসি শিশির কুমার পাল। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ ভয়েও ওসি ও পুলিশ কনস্টেবল জাহিদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দিতে রাজি হচ্ছে না।
এমন কি ওসি বহাল তবিয়তে থাকায় তদন্ত কমিটির কাছে যাতে কেউ মুখ না খোলেন সে জন্য ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারন মানুষ চুপ থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে ওসি শিশির। সূত্রে জানা গেছে, ওসি শিশির উজিরপুর মডেল থানায় যোগদানের পর থেকেই উপজেলার আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়েছে।
যার কারনে আতংকে মধ্যে থাকা উপজেলাবাসী নিজেদের জানমালের নিরাপত্তায় রাত জেগে পাহারাও দিয়েছিলো একাধারে কয়েকমাস। কিন্তু তবুও থেমে নেই চুরি-ডাকাতিসহ নানা ধরনের অপরাধ মূলক কর্মকান্ড। ২০১৮ সালের ১লা মার্চ উজিরপুর মডেল থানায় যোগদানের পরপরই ওসির নির্দেশে মাদক মামলার আসামী ছেড়ে দেওয়ার চুক্তিতে ঘুষ নিতে গিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যাহার হন।
চলতি বছরের গত ২ সেপ্টেম্বর দিনে দুপুরে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে এক উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তার মোটর সাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় তাৎক্ষনিক পুলিশকে খবর দিয়ে থানায় সাধারন ডায়েরি করা হলেও অদ্যবধি পর্যন্ত পুলিশ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করতে পারেনি।
গত ৮ আগস্ট দিবাগত রাতে ওসির নির্দেশে জামিনে থাকা মামলায় উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের পূর্ব মুন্ডপাশা গ্রামের দিনমজুর সোহরাব হোসেন বেপারীর ছেলে হাসান বেপারিকে থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা আটক করে এবং পরে ছেড়ে দেওয়ার শর্তে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবী করেন। দাবীকৃত টাকা দিতে না পারায় রাতভর হাসানকে থানা হাজতে আটকে রেখে কোনো কারন ছাড়াই পরেরদিন ৯ আগস্ট সকালে আদালতে প্রেরণ করে।
পরে কোর্ট জিআরও’র কাছে হাসানের জামিনের রি-কলের কাগজপত্র দেখালে হাসানকে ছেড়ে দেওয়া হয়। গত ২৩ জুলাই দিবাগত রাতে উপজেলা সদরের শিকারপুর মেজর এম এ জলিল সেতু সংলগ্ন দক্ষিন শিকারপুর গ্রামের পুলিশ সদস্য সালাম খানের বাসায় পরিবারের সবার হাঁত-মুখ বেঁধে মারধর করে দুর্র্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
ডাকাতিকালে ওই পুলিশ সদস্যের বাসায় থাকা স্ত্রী, ছেলে, বৃদ্ধা শ্বাশুড়ীসহ চার জনকে পিটিয়ে ডাকাতরা আহত করেছিলো। গত ৩ জুলাই বিকেলে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের উপজেলার মেজর এমএ জলিল সেতু সংলগ্ন এলাকায় পুলিশ পরিচয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের এক সুপার এজেন্টকে অস্ত্র ঠেকিয়ে ১২ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
ওই ঘটনায় থানা পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করে আটক করতে পারেনি। সর্বশেষ বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কাছে উজিরপুর ওসির বিরুদ্ধে নালিশের অপরাধে গত বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় প্রকাশ্যে থানার ভিতরে ও বাইরে রাশেদা বেগম নামে এক বিধবা বৃদ্ধাকে মারধরের অভিযোগে দেশব্যাপী সমালোচিত হয়েছেন ওসি শিশিরসহ এক পুলিশ সদস্য।
সমালোচিত এসব কর্মকান্ডে জেলা পুলিশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হলেও বহু বিতর্কিত ওসি শিশির বহাল তবিয়াতে থাকায় উজিরপুরবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
ভুক্তভোগীরা অনেকেই হয়রানির ভয়ে এই ওসির অপকর্ম নিয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। এছাড়া ওসি শিশির যোগদানের পর থেকে বিগত দেড় বছর ধরে উজিরপুর থানায় বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।
পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ধর্ষন ও প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা। অহরহ হয়রানি হচ্ছে সাধারন মানুষ। থানায় বেড়েছে চিহ্নিত দালালদের দৌড়াত্ম। তাছাড়া সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায়ও বেশ সমালোচিত ওসি শিশির।
স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, উপজেলার আলোচিত জল্লা ইউপির জননন্দিত চেয়ারম্যান নান্টু হত্যাকান্ডের পর জল্লায় মুসলমানদের বসত বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ও নারকীয় তান্ডবের ঘটনায় ওসির ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছিলো।
চেয়ারম্যান নান্টু হত্যাকান্ডের পরেরদিন ওসি শিশিরের উপস্তিতিতে বাহেরঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে তান্ডব চালায়। আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলা হয়েছিলো প্রবাসীর খোকন সরদারের বহুতলা ভবন ও একই গ্রামের হালিম সিকদারের পুত্র সাইদুল সিকাদার দোকান ঘরটি। দুর্বৃত্তরা লুট করে নিয়ে যায় মালামাল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছে, নান্টু হত্যাকান্ডের পরপরই ওসির উপস্তিতিতে বেশ কয়েকটি পরিবারের উপর অমানবিক তান্ডব চালিয়েছিলো কতিপয় সন্ত্রাসীরা। তখন ওসি শিশিরের ভূমিকা ছিলো প্রশ্নবিদ্ধ।
এমনকি আগুন দেয়ার পর তা নিয়ন্ত্রনে আনার জন্য দমকল বাহিনীকে ঢুকতে পর্যন্ত বাধা প্রদান করা হয়। এসব অভিযোগের ব্যাপারে উজিরপুর মডেল থানার ওসি শিশির কুমার পালের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।