বিডি ক্রাইম ডেস্ক, বরিশাল॥ চারিপাশে দুর্গন্ধযুক্ত নর্দমার পানি আর বিষধর সাপ ও পোকামাকড়ের আবাসস্থল ঘিরেই একটি জরাজীর্ণ কুটির। নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা কিংবা বিদ্যুৎ সংযোগ। অগোছালো আবর্জনাময়, দুর্গন্ধযুক্ত এই কুটিরে নেই মাথা তুলে দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও। এমনই এক কুটিরেই দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আড়ালে লুকিয়ে আছেন ৬৫ বছর বয়সী রহস্যময়ী এক নারী। আর ছোট একটুকরো মাটিতে পর্দার আড়ালে লুকিয়েই এতটা বছর বসবাস করছেন তিনি।
দীর্ঘ দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও আজও কারও সঙ্গে একটি কথাও বলেননি। শুধু তাই নয়, ১৫ বছরে গোসল কিংবা মল-মূত্র বিসর্জন দিতেও ওই অন্ধকার ঘর থেকে বের হননি এই রহস্যময়ী; বলছেন তার সন্তানরা। তাই সবার মনে এখন একটাই কৌতূহল— কী আছে ওই অন্ধকার কুটিরে? এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয় সহ সবার মনে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাচনাপাড়া এলাকার মৃত আবুল কালামের স্ত্রী সালেহা বেগম। বিগত ১৫ বছরে কারও সঙ্গে একটি কথাও বলেননি তিনি। আন্ধার মানিক নদী লাগোয়া একটি জীর্ণ কুটিরের এক কোনে বোরকা পড়ে আঁধারে মুখ লুকিয়ে রেখেছেন কৌতূহল সৃষ্টিকারী এই নারী।
স্থানীয়রা বলছেন, মানুষ তো দূরের থাক কোনো অবুঝ প্রাণীর বসবাসের উপযোগীও নয় ওই কুটির। তবুও তার স্বামীর মৃত্যুর পর ওই পলিথিনে মোড়ানো একটি ছোট জায়গায় বসবাস করে আসছেন সালেহা বেগম। যার চারিপাশে কাপড় দিয়ে ঢাকা রয়েছে। এমনকি তার ক্যানসার আক্রান্ত ছেলেকে এক নজর দেখতে পর্যন্ত বাহিরে উঁকি দেননি তিনি।
এই নারীর মেয়ে লাকী বেগম বলেন, গত ১৫ বছরে তাদের কারও সঙ্গেই একটি কথাও বলেননি তার মা। আর ঝড় বৃষ্টি জলোচ্ছ্বাস যাই হোক এক মুহূর্তের জন্যও ওখান থেকে বের হননি। তিনি বলেন, তার ছোট ভাই এক সময়ের গার্মেন্টস কর্মী এখন ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী।
অসুস্থতার পর ভাইয়ের স্ত্রীও ফেলে গেছেন। কিন্তু তিনি মা ভাইকে ফেলে যেতে পারেননি। একদিকে মা ভৌতিক আচরণে রয়েছেন পর্দার আড়ালে লুকিয়ে। অপরদিকে ভাইয়ের প্রাণ রক্ষায় সংগ্রাম করছেন ভীষণ ভাবে চর্মরোগে আক্রান্ত শরীর নিয়ে। তিনি বলেন, মানুষের বাসায় বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করে দুবেলা অন্ন জোগার করতে হয় তাকে। এর মধ্যে কখনো কখনো তার মাকে পর্দার আড়ালে খাবার দিলে মাঝে মধ্যে তা গ্রহণ করেন। কিন্তু কোনোদিন মুখ দিয়ে কিছু বলেননি। তাই সরকারসহ বিত্তবানদের কাছে সহায়তার জন্য অনুরোধ করেছেন লাকী বেগম।
স্থানীয় বাসিন্দা, লিটন, ইব্রাহিম, বজলু মিয়া, শারমিনসহ অনেকে মানুষ জানান, ১৫ বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেও একটি কথাও বলতে পারেননি সালেহা বেগমের সঙ্গে। এমনকি তাকে কেউ গোসল কিংবা মল-মূত্র বিসর্জন করতেও দেখেননি বলে অবাক বনে গিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, বড় বড় বিষাক্ত সাপসহ নানা পোকার বিচরণ রয়েছে ওই জীর্ণ ঘরটিতে। কিন্তু সালেহা বেগম আজও ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছেন না।
স্থানীয় মানবিক যুবক মিন্টু বলেন, মানসিক ভারসাম্যহীন অসংখ্য মানুষকে সেবা দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এই নারীর সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারেনি। যেখানে মাথা ঘোরানোর যায়গা নেই এমন একটি কুটিরে ১৫ বছর চিন্তাও করা যায় না। তার ভাষ্যমতে একটি বসবাসের উপযোগী ঘর না হলে তার ক্যানসার আক্রান্ত ছেলে এবং এই মায়ের মৃত্যু ঝুঁকি রয়েছে। তাই সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান জানান, জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করছি। আর ক্যানসার আক্রান্ত ব্যক্তিকে আবেদনের মাধ্যমে এক লাখ টাকা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেই চেষ্টা থাকবে। আর ওখানে গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তারপর ওই নারীর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।