• ৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

আবার ঘটতে পারে বড় ধরনেরে দুর্ঘটনা

আমতলীতে ৯৯টি লোহার সেতু এখনো ঝুঁকিপূর্ণ

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত জুলাই ৮, ২০২৪, ১৭:৪৫ অপরাহ্ণ
আমতলীতে ৯৯টি লোহার সেতু এখনো ঝুঁকিপূর্ণ

জাকির হোসেন, আমতলী ॥ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আমতলী উপজেলায় ৯৯টি লোহার সেতু এখনো ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় রয়েছে। সেতুগুলো ধসে আবার যে কোন সময় বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

২২ জুন আমতলীর হলদিয়া বাজার সংলগ্ন সেতু ধসে ৯জনের প্রাণহানির পর আমতলী উপজেলা এলজিইডি নড়েচরে বসেছে। তারা ঝুুঁকিপূর্ন সেতুর তালিকা করাসহ সতর্কীকরন সাইনবোর্ড টানানো এবং সেতুর প্রবেশ মুখে বাঁশের বেড়া ও প্রতিবন্ধকতা খুটি স্থাপন করেছে।

আমতলী উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৭-৯৮ থেকে শুরু করে ২০০৮-২০০৯ সাল পর্যন্ত এলজিইডির আওতায় আমতলী উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ‘হালকা যান চলাচল প্রকল্পের’ অধীনে প্রায় শতাধিক সেতু নির্মাণ করা হয়।

প্রকল্পটি ২০০৮-২০০৯ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এরপর প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি না করায় এসব সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে জনগুরুত্বপূর্ন কয়েকটি যায়গায় গার্ডার সেতু নির্মান করে দিয়েছে স্থানীয় এলজিইডি।

লোহার সেতুগুলো নির্মাণের পর এসব সেতু রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় এরই মধ্যে ২০০৭ সালের সিডরের রাতে কেওয়াবুনিয়া খালের, ২০১৫ সালের ৮জুন আঠারগাছিয়া ইউনিয়নের সোনাখালী মুচল্লী বাড়ির খালের, ২০১৫ সালের ১৪ মে সোনাখালী স্কুল এন্ড কলেজের সামনের খালের, ২০১৬ সালের ১৬ মে রোয়ানুর রাতে বাঁশবুণিয়া খালের, একই বছর ৯ জুলাই আমড়াগাছিয়া খালের, ২০১৯ সালের ১০ মার্চ কুকুয়া ইউনিয়নের কুতুবপুর খালের, ২০২২ সালের ২৪ জুন কাউনিয়া খালের, ২০২২ সালের ১৫ মে দক্ষিন পশ্চিম আমতলীর আরপাঙ্গাশিয়া খালের, ২০২২ সালের হলদিয়া ইউনিয়নের আলতাফ হোসেন মোল্লা বাড়ির খালের, ২০২৪ সালের ২৬ মে মধ্য চন্দ্রা খালের, সেতুসহ অন্তত ১৫টি সেতু অধিক জরাজীর্নতার কারনে ধসে পরে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২২ জুন শনিবার দুপুরে হলদিয়া বাজার সংলগ্ন সেতুটি মাইক্রোবাসসহ ধসে ৯ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

এর বাইরে এখনো যে সেতুগুলো খালের উপর দাড়িয়ে রয়েছে সেগুলোও শত ভাগ জরাজীর্ণ হয়ে চলাচলের অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। এরপর ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের আইলায়, ২০১১ সালের মহাসেন ও ২০১৬ সালের রোয়ানু এবং সর্বশেষ রিমালের প্রভাবে অধিকাংশ সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সেতুগুলোর সিমেন্টের স্লিপার, হাতল ও অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। সেতুগুলো এভাবে পরে থাকায় এর হাতল ও অ্যাঙ্গেলসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি হয়ে যাচ্ছে।

ধসে পরা সেতু গুলোর স্থানে এলাকার বাসিন্দারা উদ্যোগ নিয়ে বাঁশ, তক্তা, সুপারিগাছসহ অন্যান্য গাছ দিয়ে কোনো রকম মেরামত করে ঝুঁকি নিয়ে এসব সেতু পারাপার হতে বাধ্য হচ্ছেন।

এতে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারী ও শিক্ষার্থীরা। সরেজমিনে দেখা গেছে, চলতি বছরের ২২ জুন শনিবার হলদিয়া বাজার সংলগ্ন লোহার সেতু ধসের পর এখন পুরো ইউনিয়ন উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রযেছে।

উপজেলা সদরসহ ঢাকা কিংবা বরিশাল যেতে হলে এই সেতু পারাপার হয়ে ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার মানুষের চলাচল করতে হয়। বর্তমানে ধসে যাওয়া সেতুর স্থানে গ্রামবাসী তাদের চলাচল করার জন্য চাঁদা তুলে এবং নারী সাংসদ প্রভাষক ফারজানা সুমির অনুদানের টাকায় বাঁশের সাকো নির্মান করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, ব্রীজ ভাইঙ্গা যাওয়া মোগো হলদিয়া ইউনিয়নের লোকজনের যাতায়ত সব বন্ধ অইয়া গ্যাছে। এহন মোরা বাঁশ দিয়া হাক্কা বানাইয়া চলাচল করমু।

ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম স্বপন বলেন, হলদিয়া ইউনিয়নের অন্তত ৪০ হাজার লোক হলদিয়া বাজার সংলগ্ন সেতু পার হয়ে উপজেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন যায়গায় চলাচল করে। ২২ জুন সেতু ধসের পর এখন মানুষের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

তাই নিরুপায় হয়ে এলাকাবাসী এখন স্বেচ্ছা শ্রমে বাঁশের সাকো তৈরী করছে। উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া গ্রামের বাশবুনিয়া খালের জেবি শেনের হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন সেতুটি ২০১৬ সালের ১৬ মে শনিবার বিকেলে রোয়ানুর প্রভাবে মুশল ধারে বৃষ্টির সময় কয়েক জন যাত্রী সহ সেতুটির মাঝ বরাবর ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের অংশ ধসে খালের পানিতে পরে যায়।

এসময় সেতু দিয়ে পারাপার হওয়া যাত্রী দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা নাসিম ফকির, সোহেল মোল্লা ও জাহিদুল মৃধা খালে পরে গুরুতর আহত হন।

এসময় স্থানীয় লোকজন তাদের ডাক চিৎকার শুনে উদ্ধার করে আমতলী হাসপাতালে এনে চিকিৎসা করান। সেতুটি ধ্বসে পড়ায় জগৎ চাঁদ, মধ্য টেপুরা, উত্তর টেপুরা, দক্ষিণ টেপুরা, পূর্ব টেপুরা ও দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।

এছাড়া সেতুর পশ্চিম পাড়ে জেবি শেনের হাট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছোট ছোট কোমল মতি শিশুদের পারাপারে মহা ভোগান্তি দেখা দিয়েছে।

এলাকা বাসী নিরুপায় হয়ে তাদের চলাচল ঠিক রাখার জন্য বর্তমানে সেতুর জায়গায় একটি তিন তক্তার ডিঙ্গী নৌকায় খেয়া পারা পার হিসেবে চালু করেছেন গ্রামবাসীরা। আমতলীর কুকুয়া ইউনিয়নের কেওয়াবুনিয়া খালের লোহার সেতুটি সিডরের সময় দুমরে মুছরে যায়।

কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও এখনও সংস্কার করা হয়নি। স্থানীয় শিক্ষক আলম মিয়া জানান সেতুর এক প্রান্তে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সহ স্থানীয়দের চলাচলের সুবিধার জন্য বাঁশের সাঁকে দিয়ে কয়েক হাজার মানুষ চলাচল করছে।

একই অবস্থা হলদিয়া ইউনিয়নের মোল্লাবাড়ি সংলগ্ন সেতুটি ধসে পড়ার পর স্থানীয়রা একটি বাঁশের সাকো তৈরী করে পারাপার হচ্ছে। কাউনিয়া খালের সেতুটি ধসের পর সেখানে স্থানীয়রা চাঁদা তুলে প্লাস্টিকের ড্রাম এবং কাঠ দিয়ে একটি ভাসমান সেতু তৈরী করে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।

এখানে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী কাউনিয়া ইব্রাহিম একাডেমী ও কাউনিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। গত ২২ জুন শনিবার হলদিয়া ইউনিয়নের হলদিয়া বাজার সংলগ্ন সেতুটি ধসে ৯জনের প্রাণহানির পর আমতলী উপজেলা এলজিইডি নড়েচরে বসেছে।

তারা ইতোমধ্যে উপজেলার ঝুঁকিপূর্ন সেতুর তালিকা তৈরী করে সেতুর প্রবেশ মুখে সতর্কীকরন সাইনবোর্ড এবং খুটি বসিয়েছে। তালিকা অনুযায়ী দেখা যায় হলদিয়া ইউনিয়নে অধিক ঝুঁকিপূর্ন সেতু রয়েছে ১৭টি, গুলিশাখালী ইউনিয়নে ২৫টি, আরপাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নে ৮টি, কুকুয়া ইউনিয়নে ৪টি, আমতলী সদর ইউনিয়নে ৮টি, আঠারগাছিয়া ইউনিয়নে ২১টি, চাওড়া ইউনিয়নে ১২টি এবং আমতলী পৌরসভায় ৪টিসহ মোট ৯৯টি সেতু রয়েছে।

এলজিইডি আমতলী উপজেলা কার্যালয়ের প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ৯৯টি ঝুঁকিপূর্ন লোহার সেতুর তালিকা করে উর্ধতন কর্তপেক্ষের নিকট পাঠানো হয়েছে।

এসকল সেতুর প্রবেশ মুখে সতর্কী করন সাইনবোর্ডসহ ভারী যানবাহন চলাচলের প্রতিবন্ধকতার জন্য খুটি পুতে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ২০৯৭-২০৯৮ সালে গ্রাামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক সৃষ্টির জন্য এসব সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই প্রকল্পটি বাতিল করায় ঝুঁকিপূর্ন সেতুগুলো মেরামত কিংবা সংস্কার করা যায়নি।

তিনি আরো বলেন, যে সকল স্থানে লোহার সেতু রয়েছে তা অপসারন করে গার্ডার সেতু নির্মানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছ। আমতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গোলাম সরোয়ার ফোরকান বলেন, আমতলী উপজেলার সকল লোহার সেতু ঝুকিপূর্ন। ঝুঁকিপূর্ন এই সেতু পার হয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করে।

তাই যেকোন সময় এই ঝুঁকিপূর্ন সেতু ধসে আবার বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। দূর্ঘটনার আগেই এসকল সেতু অপসারন করে গার্ডার সেতু নির্মান করা প্রয়োজন।

বরগুনার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদি হাসান খান বলেন, জেলার সকল ঝুঁকিপূর্ন সেতুর তালিকার কাজ চলছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ন সেতু চিহ্নিত করে সেগুলোর তালিকা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হবে।