জাকির হোসেন, আমতলী॥ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সব জায়গায় বিএনপি ফুরপুরে মেজাজে থাকলেও আমতলীতে এর বিপরীত চিত্র লক্ষ করা গেছে। এখানে বিএনপিতে ঐক্যের পরিবর্তে অনৈক্যের কারনে নিজেদের ঘর এখন আগুনে জ্বলছে। দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ, মামলা, পালটা মামলা, সংবাদ সম্মেলন, পাল্টা সংবাদ সম্মেলন ঝাড়– মিছিলসহ একে অপরের বিরুদ্ধে নানা রকম বিষোধগারের ঘটনায় বিএনপি এখন বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে।
নিজেদের ৩টি মামলায় ১৮৩জন আসামী হয়ে তারা এখন আত্মগোপনে রয়েছে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিক্ষুদ্ধ জনতার সাথে বিএনপির নেতা কর্মীরা আওয়ালীগ অফিস, পৌর ভবন এবং পৌরসভার সেবা প্রদানকারী কয়েকটি গাড়ি ও নেতা কর্মীদের ঘড়বাড়ী ভাংচুরসহ অগ্নিসংযোগ করে।
এর মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ঝিমিয়ে থাকা বিএনপির অঙ্গসংগঠন বেশ চাঙ্গা হয়ে তারা আওয়ামীলীগ বিরোধী নানা কর্মসূচী নিয়ে মাঠে নামে।
বিএনপির সাবেক সভাপতি জালাল উদ্দিন ফকির ও সদস্য সচিব তুহিন মৃধার মধ্যে পূর্ব থেকে চলে আসা বিএনপির অনৈক্য ৫ আগস্টের পর যেন আরো জোরালোভাবে দেখা যায়।
একে অপরের বিরুদ্ধে আনেন চাঁদা বাজির অভিযোগ। এঘটনার বহি:প্রকাশ ঘটে ২৮ আগস্ট বুধবার দুপুরে। ওই দিন সদর ইউনিয়নের খুড়িয়ার খেয়াঘাট এলাকায় হুমায়ুন কবির মিল্টন এর দোকানে চাঁদা চাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জালাল ফকির ও তুহিন মৃধার অনুসারীদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ওই সংঘর্ষে সদস্য সচিব তুহিন মৃধার বড় ভাই হালিম মৃধাসহ উভয় পক্ষের ৭ জন আহত হয়। পরের দিন ২৯ আগস্ট জালাল ফকিরের অনুসারী হুমায়ুন কবির মিল্টন বাদী হয়ে আমতলী উপজেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তুহিন মৃধাকে প্রধান আসামী করে বিএনপির ৫ নেতা কর্মীর বিরুদ্ধে একটি চাঁদা দাবীর অভিযোগ এনে মামলা করেন।
ওই দিন রাতে তুহিন মৃধা নিজে বাদী হয়ে জালাল ফকিরের ছেলে রাহত ফকিরসহ বিএনপির ২৬ নেতার নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত ২৫-৩০ জনের বিরুদ্ধে আমতলী থানায় একটি চাঁদা বাজী ও মারধরের অভিযোগ এনে পাল্টা মামলা করেন।
১ সেপ্টম্বর জালাল ফকিরের অনুসারী মো. রাসেল আকন বাদী হয়ে আমতলী থানায় তুহিন মৃধাকে প্রধান আসামী করে চাঁদাবাজী, হত্যার চেষ্টাসহ ২২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫০-১০০ জনকে অজ্ঞাত আসামী করা হয়েছে।
৩টি মামলায় বিএনপির বিভিন্ন পর্য়ায়ের নেতা কর্মীসহ নাম উল্লেখ করা আসামীর সংখ্যা ৫৩ জন। এতে অজ্ঞাত আসামী ১৩০ জন।
৩০ আগস্ট শুক্রবার সকাল ১১ টায় তুহিন মৃধা জালাল ফকিরের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজীসহ লুটপানের অভিযোগ এনে বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন।
একই দিন দুপুরে জালাল ফকিরের অনুসারী ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক জহিরুল ইসলাম মামুন আমতলীর দলীয় কার্যালয়ে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন।
সেখানে তুহিন মৃধার বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগের অফিস দখলসহ চাঁদাবাজির অভিযোগ আনেন। ৩১ আগস্ট শনিবার দুপুরে জালাল ফকিরের অনুসারীর খুড়িয়ার খেয়াঘাট নামক স্থানে তুহিন মৃধার চাঁদাবাজি বন্ধসহ তার বিচারের দাবীতে এক মানববন্ধন কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হয়।
একই দিন জালাল ফকিরের চাঁদাবাজী বন্ধ এবং হামলা মামলার প্রতিবাদে ছুরিকাটা নামক স্থানে মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে তুহিন মৃধার অনুসারীরা।
আমতলী উপজেলা বিএনপির নেতা কর্মীরা নিজেদের মামলা হামলাসহ নানা কারনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সাবেক আহবায়ক জালাল উদ্দিন ফকিরের বিরুদ্ধে আওয়ামী পন্থী এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর নিকট থেকে টাকা নিয়ে তার পক্ষ অবলম্ভনের একটি অডিও ভাইরাল হয়।
এঘটনা বায়োনাট বলে দাবী করে জালাল উদ্দিন ফকির বলেন, ওই অডিও ছিল কাটছাট করা তুহিন মৃধার বানানো। এঘটনায় পদ হারান জালাল উদ্দিন ফকির।
ওই ঘটনার জন্য তুহিন মৃধাকে দায়ী করছেন জালাল উদ্দিন ফকির। এর পর থেকেই তাদের দুজনের মধ্যে বিারোধ দেখা দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির প্রথম সারির অন্তত দু’জন নেতা বলেন, শহীদ রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠত একটি আদর্শিক দল বিএনপি।
দলটির নেতা কর্মীরা ১৬ বছর ধরে আওয়ামীলীগের মামলা হামলার ভয়ে আত্মগোপনে ছিল। ছাত্র জনতার আন্দোলনে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আমাদের সামনে সুদিন অপেক্ষা করছে।
কিন্তু আমরা এখন নিজেদের কোন্দলে বিপর্যস্ত। দল গোছাবো না নিজেদের মামলা মোকদ্দমা মোকাবেল করবো। এঘটনার একটি সুষ্ঠু সমাধান দরকার।
আমরা আশা করি কেন্দীয় নেতৃবৃন্দ বিষয়টি আমলে নিয়ে দলীয় কোন্দল সমাধান করবেন। আমতলী উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সদস্য মো. জসিম উদ্দিন হাওলাদার তার নিজ ভেরিফায়েড ফেজবুক আইডিতে আমতলী উপজেলা বিএনপির দ্বন্দ্ব নিরশনের জন্য ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারেক রহমান ও সহ-সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম মনির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বিএনপির সদস্য সচিব তুহিন মৃধা বলেন, আমি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একজন আদর্শের সৈনিক। গনতন্ত্রের মানষ কন্যা আপোশহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আগামী দিনের রাষ্ট্র নায়ক তারেক রহমানের আদর্শে উজ্জীতিহ হয়ে বিএনপি করি।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাবেক সভাপতি জালাল উদ্দিন ফকিরের নেতৃত্বে আমতলী উপজেলার খুরিয়ার খেয়াঘাটসহ সব জায়গায় চাঁদাবাজি করেছেন।
চাঁদা বাজির খবর পেয়ে আমি সেদিন খুরিয়ার খেয়াঘাট এলাকায় চাঁদা বন্দের নির্দেশ দেই। এজন্য সে আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে হামলা করে।
আমার বড় ভাই তুহিন মৃধাকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হাতের আঙ্গুল কেটে ফেলে। জালাল ফকির এগুলো ঘটিয়েই ক্ষান্ত হয়নি।
সে একের পর এক মিথ্যা মামলাসহ নানা রকম হয়রানি করছে। আমি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নিকট এবিষয়ে তদন্ত দাবী করছি। আমতলী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন ফকির বলেন, আমার কোন নেতা কর্মীরা চাঁদাবাজির সাথে জড়িত নয়।
তুহিন মৃধা চাঁদাবাজি করে আমার উপর দোষ চাপাতে চাইছেন। তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, তুহিন মৃধা তার ভাই এবং আত্মীয় স্বজন নিয়ে আমার অনুসারী নেতা কর্মীদের উপর হামলা করে আহত করেছেন। আবার মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন।
তিনি আরো বলেন, তুহিন মৃধা আওয়ামীলীগের এজন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছেন। তার পরিবারের সবাই আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত।
তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদস নিবার্চাচনের সময় আমার বিরুদ্ধে একটি ভুয়া অডিও তৈরী করে প্রচার করে। যার কারনে আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, আমি ছাত্রদল থেকে ত্যাগের রাজনীতি করে আজ দলের এ পর্যায়ে এসেছি। আশাকরি দল আমাকে সঠিক মূল্যায়ন করবে।
আমতলী উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক জহিরুল ইসলাম মামুন (ভিপি মামুন) বলেন, দলকে শক্তিশালী করার জন্য ঐক্যের বিকল্প নেই। কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে দলের ভিতরের দ্বন্দ্ব নিরশন হবে বলে আমি আশা করি।