বিডি ক্রাইম ডেস্ক, বরিশাল॥ কাজের সন্ধানে ১৭ বছর আগে বাড়ি ছেড়েছিলেন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার ছোট টেংরা গ্রামের আলমগীর হোসেন (৪৫)।
এরপর দীর্ঘদিন তার কোনো খোঁজ না পাওয়ায় পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা ধরে নিয়েছিলেন, তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। এমনকি তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় বাড়িতে ও স্থানীয় মসজিদে মিলাদ ও দোয়ার আয়োজনও করা হয়েছিল।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দীর্ঘ ১৭ বছর পর হঠাৎ জীবিত অবস্থায় নিজ গ্রামে ফিরে এসেছেন আলমগীর। তবে ফিরে এসে তিনি পেলেন না সেই চেনা মানুষগুলোকে। তার বাবা-মা দুজনই মারা গেছেন। দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার কারণে স্ত্রীও অন্যত্র বিয়ে করেছেন। একমাত্র মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে ১৭ বছর পর জন্মভূমিতে ফিরেও নিজের বলতে এখন যেন কিছুই নেই আলমগীরের। বর্তমানে বড় ভাইয়ের বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট টেংরা গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন। প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় পর তাকে গ্রামে ফিরে আসতে দেখে স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিস্ময়। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, যাকে মৃত মনে করে এতদিন দোয়া-মিলাদ করা হয়েছে, সেই মানুষটিই একদিন হঠাৎ ফিরে আসবেন।
স্থানীয়রা জানান, ১৭ বছর আগে কাজের সন্ধানে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান আলমগীর। এরপর তার সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ ছিল না। কোথায় আছেন, কেমন আছেন কিংবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না কোনো তথ্যই জানতে পারেননি স্বজনরা। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর একসময় পরিবার ও এলাকাবাসীর ধারণা হয়, আলমগীর আর বেঁচে নেই। তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় বাড়িতে এবং স্থানীয় মসজিদে মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করা হয়।
আলমগীরের বড় ভাইয়ের স্ত্রী বলেন, ‘এত বছর কোনো খোঁজ না পেয়ে আমরা ধরে নিয়েছিলাম আলমগীর আর বেঁচে নেই। তার নামে বাড়িতে ও মসজিদে মিলাদ পড়ানো হয়েছিল। ১৭ বছর পর সে আবার জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবে এটা কখনো ভাবিনি।’
তবে আলমগীরের ফিরে আসার গল্পটিও কম বিস্ময়কর নয়। তার দাবি, ১৭ বছর আগে কাজের সন্ধানে ঢাকায় গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে এক ব্যক্তি তাকে কাজ দেওয়ার কথা বলে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেন। এরপর প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা গাড়িতে করে তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১২ জন ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
আলমগীরের ভাষ্য অনুযায়ী, অজ্ঞাত ওই স্থানে উঁচু দেয়ালঘেরা একটি জায়গায় তাদের আটকে রাখা হয়। সেখানে দিনের পর দিন তাদের দিয়ে কাজ করানো হতো। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না এবং বাইরে বের হওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। এভাবেই কেটে যায় তার জীবনের দীর্ঘ ১৭ বছর।
আলমগীর জানান, দীর্ঘ সময় পর একপর্যায়ে তাকে ও অন্যদের চোখ বেঁধে ঢাকার একটি এলাকায় এনে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর একটি জায়গায় কাজ করে ৫০০ টাকা উপার্জন করেন তিনি। সেই টাকা নিয়েই শেষ পর্যন্ত নিজের গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসেন ছোট টেংরার নিজ বাড়িতে।
গ্রামে ফিরে প্রথমে স্বজনদের কাছে নিজের পরিচয় দিলে সৃষ্টি হয় অবিশ্বাস আর বিস্ময়ের। পরে তাকে চিনতে পারেন স্বজনরা। জীবিত অবস্থায় ফিরে আসার আনন্দে স্বজন ও প্রতিবেশীরা যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি তার বর্তমান অবস্থা দেখে কষ্টও পেয়েছেন।
কারণ ১৭ বছর আগে যে সংসার রেখে আলমগীর বাড়ি ছেড়েছিলেন, ফিরে এসে সেই সংসার আর নেই। বাবা-মা দুজনই মারা গেছেন। স্ত্রীও নতুন করে সংসার পেতেছেন। একমাত্র মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে দীর্ঘ ১৭ বছর পর নিজ গ্রামে ফিরেও আলমগীর যেন ফিরে পেয়েছেন কেবল পুরোনো স্মৃতি আর জন্মভিটা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন আলমগীর। বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর পারিবারিক নানা সংকটের মধ্যেই তার বেড়ে ওঠা। জীবিকার তাগিদে একসময় কাজের সন্ধানে বাড়ি ছাড়েন। কিন্তু এরপর তার দীর্ঘ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া পুরো পরিবারকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।
১৭ বছর পর আলমগীরের ফিরে আসায় গ্রামবাসীর মধ্যে একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে তার অসহায়ত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর আক্ষেপ।
স্থানীয়রা বলছেন, এত দীর্ঘ সময় পর ফিরে আসা একজন মানুষের সামনে এখন নতুন করে জীবন শুরু করার বড় চ্যালেঞ্জ। তার হাতে নেই অর্থ-সম্পদ, নেই নিজের সংসার কিংবা স্থায়ী কোনো আশ্রয়।
বর্তমানে বড় ভাইয়ের বাড়িতেই থাকছেন আলমগীর। স্বজনদের সহায়তায় কোনোভাবে দিন কাটছে তার। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ১৭টি বছর হারিয়ে ফেলার পর এখন নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, আলমগীরের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তাকে পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হলে হয়তো নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাবেন তিনি।