বিডি ক্রাইম ডেস্ক, বরিশাল॥ পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে জেলের জালে ধরা পড়েছে দৃষ্টিনন্দন ও বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ লাল কোট।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) মাছটি আলিপুর মৎস্য বন্দরের মেসার্স মায়ের দোয়া ফিস আড়তে আনা হলে স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. ছগির আকন এটি ১ হাজার টাকায় কিনে সংরক্ষণ করেন।
জানা গেছে, গত রোববার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া এফবি জারিফ-৪ ট্রলারের মাঝি আসাদ মাঝির জালে মাছটি ধরা পড়ে। পরে তিনি মাছটি আলিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। এসময় একনজর দেখতে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে যায়।
আসাদ মাঝি বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সময় হঠাৎ জালে মাছটি উঠে আসে। এ ধরনের মাছ আগে খুব একটা দেখিনি। এর উজ্জ্বল লাল রঙ দেখে আমরা সবাই অবাক হয়ে যাই।
মাছটির ক্রেতা মো. ছগির আকন বলেন, ‘মাছটি দেখতে খুব সুন্দর ও ব্যতিক্রম হওয়ায় সংরক্ষণের জন্য কিনেছি। এমন বিরল মাছ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছটি সৈনিক মাছ, যা ইংরেজিতে Redcoat Squirrelfish নামে পরিচিত। এটি Holocentridae পরিবারের একটি সামুদ্রিক মাছ। বাংলাদেশে এটি লাল কোট, লাল সৈনিক মাছ বা সৈনিক মাছ নামেও পরিচিত। এসব বিরল সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়লে সেটির ছবি, অবস্থান, দৈর্ঘ্য ও ওজনসহ তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এতে দেশের সামুদ্রিক জীব-বৈচিত্র্য সম্পর্কে গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও সমৃদ্ধ হবে।
ব্লু অ্যাকশন ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত ডব্লিউসিএস ও ওয়ার্ল্ডফিশের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান বলেন, ‘মাছটির উজ্জ্বল লাল বর্ণ, শরীরজুড়ে রূপালি-সাদা ডোরাকাটা দাগ এবং বড় চোখ এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এটি মূলত নিশাচর প্রজাতির মাছ, যা বঙ্গোপসাগরসহ ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের প্রবাল প্রাচীর, পাথুরে তলদেশ ও রিফ-সংলগ্ন এলাকায় বিচরণ করে। ছোট চিংড়ি, কাঁকড়া ও অন্যান্য তলদেশীয় অমেরুদণ্ডী প্রাণী খেয়ে এরা সামুদ্রিক খাদ্যজালের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে বড় শিকারি মাছের খাদ্য হিসেবেও এ প্রজাতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান রাজিব সরকার বলেন, ‘Redcoat Squirrelfish বাংলাদেশের সামুদ্রিক মাছের তালিকাভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি। সাধারণত এ মাছের দৈর্ঘ্য ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার হলেও অনুকূল পরিবেশে প্রায় ৩২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। দিনের বেলায় এটি প্রবালপ্রাচীর, পাথুরে গুহা বা ফাটলে আশ্রয় নেয় এবং রাতে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। এ ধরনের মাছের উপস্থিতি বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক জীব-বৈচিত্র্য, প্রবালপ্রাচীরের সুস্থতা এবং সামগ্রিক পরিবেশগত স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সাগরের পরিবেশগত পরিবর্তন এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার পরিধি বাড়ার কারণে মাঝে মাঝে এমন বিরল প্রজাতির মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়ছে। এসব তথ্য ভবিষ্যতে সামুদ্রিক জীব-বৈচিত্র্য গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
উল্লেখ্য, কুয়াকাটা উপকূলে এর আগেও বিভিন্ন সময় বিরল ও ব্যতিক্রমী সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঘটনা গবেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে।