• ১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৯শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

বাবুগঞ্জ ইউএনও অফিসে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর দাপট,৮ বছর ধরে অঘোষিত নিয়ন্ত্রক দিপক

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত মে ১৭, ২০২৬, ২১:০৩ অপরাহ্ণ
বাবুগঞ্জ ইউএনও অফিসে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর দাপট,৮ বছর ধরে অঘোষিত নিয়ন্ত্রক দিপক

স্টাফ রিপোর্টার:বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে কর্মরত প্রসেস সার্ভেয়ার (জারি কারক) দিপক চন্দ্র দাসকে ঘিরে নানা অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার ও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ প্রায় আট বছর ধরে নিজ বাড়ির পাশের অফিসে কর্মরত থাকার সুযোগে তিনি উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে শক্তিশালী বলয় তৈরি করে অঘোষিত নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়া এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অস্বাভাবিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তিনি পুরো উপজেলা প্রশাসনকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।” “তার প্রভাব নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।” সূত্র জানায়, বরিশালের সাবেক জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমানের দায়িত্বকালীন সময়ে ২০১৭ সালের শেষ দিকে ডিসি অফিসের সাবেক বিতর্কিত নাজির হাবিবের তদবিরে নাইট গার্ড পদে চাকরি পান দিপক চন্দ্র দাস। চাকরিতে যোগদানের আগে তিনি বরিশাল ডিসি অফিসে ওমেদার হিসেবে কাজ করতেন। এমনকি কিছুদিন ডিসি বাংলোতেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে। চাকরি পাওয়ার পর থেকেই বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে কর্মরত আছেন তিনি। তার বাড়ি উপজেলা পরিষদ ও ইউএনও বাংলোর দুই মিনিটের পথ হওয়ায় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের অভিযোগ, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হলেও তিনি কার্যত ইউএনও অফিসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অতীত ও বর্তমান একাধিক উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নীরব সহযোগিতা ও প্রশ্রয়ে দিপক চন্দ্র দাস বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ইউএনওদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। এমনকি বিভিন্ন কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে ইউএনওদের কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ দিলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং অভিযোগকারীরাই বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দিপক একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হলেও তিনি নিজেকে অনেকটা কর্মকর্তার মতো আচরণ করেন। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, প্রকল্পের কাজ, আর্থিক কাগজপত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন সিদ্ধান্তমূলক কার্যক্রমেও তার অস্বাভাবিক প্রভাব রয়েছে।” হিসাব সহকারী ও অফিস সহকারীদের দায়িত্ব থাকা বিভিন্ন ফাইলও দিপক নিজেই পরিচালনা করেন। এমনকি প্রকল্প সংক্রান্ত নথি টাইপিং, বিল প্রস্তুত ও চেক লেখার কাজও তাকে করতে দেখা যায়। সরেজমিনে গতকাল ১৬ মে শনিবার সরকারি ছুটির দিনে দুপুর ১২টা ১৩ মিনিটে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অফিস সহকারী (নাজির) সৈয়দ বসির আহমেদের কম্পিউটারে বসে বিভিন্ন প্রকল্পের কাগজপত্র টাইপ করছেন দিপক চন্দ্র দাস। এ সময় তাকে ইউএনও’র স্বাক্ষরযুক্ত ঠিকাদারদের বিল সংক্রান্ত চেক প্রস্তুত করতেও দেখা যায়। এ সংক্রান্ত ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। ৪র্থ শ্রেণীর এ কর্মচারী প্রায় প্রতিদিনই অফিসের কর্মকর্তাদের চেয়ার দখল করে নিজেই কর্মকর্তা বনে গিয়ে ইউএনও অফিসের বেশিরভাগ ফাইল করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর এমন অস্বাভাবিক ক্ষমতা ও দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দিপক চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগসমূহ খতিয়ে দেখতে বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। জানাগেছে, একই স্থানে প্রায় ৮ বছর ধরে কর্মরত থাকায় তিনি প্রশাসনের ভেতরে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন দপ্তরের বরাদ্দ,

প্রকল্প, বিল-ভাউচার ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ইউএনও অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) ছবি রানী প্রায় আড়াই বছর আগে আমতলী থেকে বদলি হয়ে বাবুগঞ্জ ইউএনও অফিসে আসলেও তার বেশির ভাগ ফাইল দিপক করেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছবি রানীকে শুধু চেয়ার টেবিল দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি বরিশাল সদর উপজেলা থেকে বদলি হয়ে হিসাব সহকারী মোঃ ফারহান বাবুগঞ্জ ইউএনও অফিসে যোগদান করলে তাকেও কোন দায়িত্ব দেয়া হয়নি। তার বেশিরভাগ ফাইল অঘোষিতভাবে করে যাচ্ছেন জারি কারক দিপক চন্দ্র দাস। গত ৯ মাস পূর্বে বাকেরগঞ্জ উপজেলা থেকে বদলি হয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে যোগদান করা অফিস সহকারী এনামুল হককেও শুধু চেয়ার টেবিল দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। যদিও অফিস সহকারী এনামুল হক কয়েক দিন পূর্বে বরিশাল ডিসি অফিসে বদলি হয়ে আসেন। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, দিপকের বাড়ি উপজেলা পরিষদের পাশে হওয়ায় সার্বক্ষনিক ইউএনও’র চোখের সামনেই থাকেন তিনি। ‘‘যে কারনে বাবুগঞ্জে আসা সকল ইউএনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।” একাধিক সূত্রের দাবি, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা, উপজেলা তথ্যসেবা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও), উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী, উপজেলা বন কর্মকর্তা, থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকাণ্ডেও প্রভাব বিস্তার করে সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কোনো কর্মকর্তা তার কথামতো না চললে তাদের বিরুদ্ধে ইউএনও’র কাছে নেতিবাচক তথ্য দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও উঠেছে এ পিওনের বিরুদ্ধে। এছাড়া স্থানীয় কতিপয় সাংবাদিককে ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের চাপে রাখার অভিযোগও উঠেছে। তবে ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তার দ্বারা হয়রানীর শিকার একাধিক কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি বার্তা বিভাগের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বরাদ্দ ও বিল-ভাউচারের অর্থ আত্মসাতে অফিস সহকারী (নাজির) সৈয়দ বসির আহমেদের সঙ্গে দিপকের একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে সূত্রের দাবী। আপ্যায়ন খাত, টিএ বিল, প্রসেস বিল, কম্পিউটার মেরামত, অফিস সরঞ্জামসহ বিভিন্ন খাতের সরকারি বরাদ্দের অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে উত্তোলন ও ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা সভা, সমন্বয় সভা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খাতের বরাদ্দ থেকেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে দিপক-বসিরের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দিপক দাস পূর্বের ন্যায় বর্তমান ইউএনও স্যারের কাছের লোক। তার মাধ্যমে সকল আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। ৫ আগস্টের পর দিপক উপজেলার সকল অফিসারের দপ্তর থেকে বরাদ্দ নিয়ে লুটপাট করেছেন। বেশিরভাগ বরাদ্দ নিয়েছেন পিআইও অফিস ও উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে। বরাদ্দ ভাগিয়ে তার ঘনিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের প্রকল্পের সিপিসি বানিয়ে প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে দিপকের বিরুদ্ধে। একই সাথে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও প্রশাসকদের সাথে আতাত করে প্রকল্প ভাগিয়ে নিয়ে কাজ না করেই বিল তুলে ভাগভাটোয়ার করেছেন বলে একাধিক সূত্র দাবী করেছেন। তার মূল দায়িত্ব চিঠিপত্র বিলি করা হলেও সে মেতেছে লুটপাটের মহাৎসবে। প্রতিটি চিঠি জারির জন্য সরকার থেকে ৪৫০ টাকা করে বরাদ্দ করা হয়। প্রতিবছর বাবুগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৫০ হাজার টাকার অধিক বরাদ্দ আসে। অভিযোগ উঠেছে অর্থ বরাদ্দের সমপরিমান চিঠি উপজেলায় জারি না হলেও অফিস সহকারী সৈয়দ বসির আহমেদ ভুয়া বিলের মাধ্যমে উক্ত টাকার তুলে বরাদ্দকৃত অর্থ উত্তোলন করে ভাগ বাটোয়ারা করে আত্নসাত করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় থেকে যত বরাদ্দ আসে, তা দিয়ে প্রতি অর্থ বছরে অফিসের কাজ না করে উক্ত টাকা দিপক ও নাজির আত্নসাত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নাজির বসিরও এই উপজেলায় সাড়ে ৫ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর এমন অস্বাভাবিক ক্ষমতা, ৮ বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল থাকা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর বিরুদ্ধে এত বিস্তর অভিযোগ ওঠার পরও দীর্ঘদিন কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাই অভিযোগসমূহ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।” এসব অভিযোগের বিষয়ে দিপক চন্দ্র দাস এর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার এমন কোন ক্ষমতা নেই। কেউ আপনাকে ভুল তথ্য দিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনার সরকারী নাম্বারে একাধিকবার কল এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোন উত্তর দেননি।