বরিশাল নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ও দৃষ্টিনন্দন আবাসিক এলাকা সিঅ্যান্ডবি সড়ক। আর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা সাগরদী বাজার। ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের ১২ কিলোমিটার অংশ নগরীর বুক চিরে বয়ে গেছে। তার দু’পাশেই গড়ে উঠেছে এ জনপদ। মহাসড়কের দু’পাশে নির্মিত হয়েছে সর্বোচ্চ ১০তলাসহ অগণিত বহুতল অট্টালিকা। এসব অট্টালিকা এবার মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে চার লেনের মহাসড়ক করার পরিকল্পনা নিয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। ‘ফরিদপুর-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের আওতায় এ কাজ হবে। এ জন্য নগরীর মধ্যে মহাসড়কের দু’পাশে ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। তবে সওজের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে নগরীর শত শত পরিবার। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নগরীর একপাশ দিয়ে চার লেন বাইপাস সড়ক নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়রা বলছেন, এতে নগরীতে বসবাসকারী হাজার হাজার পরিবার শুধু ভিটেমাটি হারা হবেন না, বরিশাল পরিণত হবে একটি বিপজ্জনক নগরীতে। কারণ পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে মালবাহী বড় বড় লরি ও কনটেইনারগুলো চলাচল করবে নগরীর বুক চিরে। সওজের এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছে সম্ভাব্য ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তারা এরই মধ্যে গঠন করেছেন ‘শহর বাইপাস সড়ক বাস্তবায়ন কমিটি’।
তাদের বক্তব্য, নগরী নিরাপদ রাখতে প্রায় দুই বছর আগে গড়িয়ারপাড় থেকে চহঠা-বারুজ্জারহাট-রুইয়ারপুল-টিয়াখালী-দপদপিয়া এলাকা দিয়ে বিকল্প চার লেন বাইপাস মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সওজ। বরিশাল-ঢাকা এবং বরিশাল-কুয়াকাটা সড়কের সংযোগ হবে এই বাইপাস। কিন্তু সেটা বাদ দিয়ে নগরীর মহাসড়কটি চার লেন করার উদ্যোগ একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত। এতে শত শত বহুতল ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে মানুষকে পথে বসানো হবে।
বরিশাল সওজ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কে বরিশাল নগরীর প্রবেশদ্বার গড়িয়ারপাড় মোড় থেকে শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু (দপদপিয়া সেতু) পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার বরিশাল সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত। বিভাগের পাঁচ জেলার পণ্য ও যাত্রীবাহী পরিবহন নগরীর মাঝ বরাবর মহাসড়ক ব্যবহার করায় এই ১২ কিলোমিটার অতি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত।
সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা জানান, ভূমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন হয়েছে। বর্তমান মহাসড়কটিই চার লেন করা হবে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত চার লেনে উন্নীত করতে প্রয়োজন হবে দেড়শ’ ফুট প্রশস্ত জমি।
সওজের উচ্চপর্যায়ের সার্ভে বিভাগ মহাসড়কের অধিগ্রহণ করা বর্তমান জমির সঙ্গে প্রয়োজনীয় আরও ৩০২ একর জমি অধিগ্রহণের নকশা চূড়ান্ত করেছে। বরিশাল জেলা অংশে অধিগ্রহণ করতে হবে ৯০ দশমিক ৫৮ একর জমি।
প্রকল্প পরিচালক ও সওজের বরিশাল বিভাগীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুশীল কুমার সাহা বলেন, এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে। ২০২০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হবে। সংশ্নিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক এ সময়ের মধ্যে অধিগ্রহণ সম্পন্ন করবেন।
এদিকে নগরীর মধ্যে জমি অধিগ্রহণের খবরে মহাসড়ক সংলগ্ন জমি ও ভবন মালিকরা সওজের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সিঅ্যান্ডবি সড়কের বাসিন্দা বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম নীলু বলেন, বরিশাল ছাড়া দেশের কোথাও মূল নগরীর ভেতর দিয়ে মহাসড়ক নেই। নগরীর ভেতরের মহাসড়ক চার লেন উন্নীত করার সিদ্ধান্তে হাজারো পরিবারের জীবন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
বাইপাস সড়ক বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মুকিবুর রহমান মুকিব বলেন, নগরীর মধ্যে অধিগ্রহণের জন্য তালিকাভুক্ত জমিতে পাঁচতলার ওপরে ভবন রয়েছে কমপক্ষে ২০০টি। ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া কেউ মানবেন না। জাকির হোসেন সুলতান নামে এক ভবন মালিক বলেন, ‘জীবনের সব আয় দিয়ে ভবনটি করেছি। উচ্ছেদ করলে হয়তো ক্ষতিপূরণ পাব। জীবনের শেষ বয়সে এসে নতুন করে এমন ভবন আর করতে পারব না।’
প্রকল্প পরিচালক সুশীল কুমার সাহা বলেন, অনেকে আপত্তি নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন। কিন্তু নগরী এড়িয়ে বিকল্প চার লেনের বাইপাস নির্মাণের পরিকল্পনা আপাতত তাদের নেই।