• ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ৫ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর হিসেবে খ্যাত ‘টেংরাগিরি’ সংরক্ষিত বণাঞ্চলে চোরের থাবা

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ১৭:০৮ অপরাহ্ণ
প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর হিসেবে খ্যাত ‘টেংরাগিরি’ সংরক্ষিত বণাঞ্চলে চোরের থাবা

আমতলী প্রতিনিধি॥ বরগুনার তালতলীতে প্রকাশ্যে চোরের থাবায় উজাড় হচ্ছে উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর হিসেবে খ্যাত ‘টেংরাগিরি’ সংরক্ষিত বণাঞ্চল।

অভিযোগ উঠেছে, বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কয়েকটি সক্রিয় চক্র প্রতিনিয়ত এই বনের মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করছে। বন উজাড়ের উৎসব চললেও নীরব ভূমিকা পালন করছে বন বিভাগ।

স্থানীয়রা বন ধ্বংসের প্রতিবাদ করলে তাদের উল্টো গাছ কাটা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন বন কর্মকর্তারা। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টেংরাগিরি বনের আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর।

প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা টেংরাগিরি একসময় সুন্দরবনের অংশ ছিল। ১৯২৭ সালের বন আইনের জরিপ অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই এটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয়।

১৯৬৭ সালে টেংরাগিরি বনাঞ্চল হিসেবে নামকরণ করা হয়। বনে রয়েছে গেওয়া, জাম, ধুন্দল, কেওড়া, সুন্দরী, বাইন, করমচা, কেওয়া, তাল, কাঁকড়া, বনকাঁঠাল, রেইনট্রি, হেতাল, তাম্বুলকাটা, গরানসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।

এছাড়া রয়েছে কাঠবিড়ালি, বানর, ৪০ প্রজাতির সাপ, সজারু, শূকর, কচ্ছপ, শেয়াল, বনমোরগসহ বেশকিছু বন্যপ্রাণী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবুজে ঘেরা তালতলী উপজেলার টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যা দ্বিতীয় সুন্দরবন নামে পরিচিত।

উপকূলীয় জীববৈচিত্র ও বন্যপ্রাণীর এই নিরাপদ আবাসস্থলে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে অবৈধভাবে গাছ কাটার মহোৎসব।

সম্প্রতি ছকিনা বিট কর্মকর্তার কার্যালয়ের ঠিক সামনেই দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে গাছ কাটা হচ্ছে। গাছ কেটে তা ট্রলারে বেঁধে নির্দ্বিধায় নদীপথে পাচার করছে একটি চক্র।

একই চিত্র দেখা গেছে, নলবুনিয়া বিট কার্যালয় সংলগ্ন এলাকাতেও। পর্যটন কেন্দ্র ‘শুভ সন্ধ্যা’ সমুদ্র সৈকত এলাকা থেকে একের পর এক মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে।

চক্রটি রাতের আঁধারে যেমন কাঠ পাচার করছে, তেমনি অনেক গাছ কেটে বনের ভেতরেই ফেলে রাখছে সুবিধাজনক সময়ে সরিয়ে নেওয়ার জন্য।

শুধু গাছ কেটেই তারা ক্ষান্ত হচ্ছে না। চুরির আলামত ও প্রমাণ মুছে ফেলতে উপড়ে ফেলা হচ্ছে গাছের গোড়া ও শিকড়।

এসময় শুধুমাত্র ‘শুভ সন্ধ্যা’ সমুদ্র সৈকত এলাকার প্রায় ১ কিলোমিটার বনে দেখা গেছে, গত ৩-৪ দিনের মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক বনের গাছ কেটে নিয়ে গেছে কয়েকটি পাচারকারি চক্র।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রিফাত ও বাবুল হাওলাদার জানান, “চোখের সামনে বন উজাড় হতে দেখেও তারা কিছু বলতে পারছেন না।

গাছ কাটার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই বন বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের উল্টো গাছ কাটার মামলা দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখাচ্ছেন।

ফলে আতঙ্কে প্রতিবাদ করার সাহস হারাচ্ছেন তারা।” পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ -এর তালতলী শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান বলেন, টেংরাগিরি বনাঞ্চলটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র বাতাসের আঘাত থেকে উপকূলের মানুষদের রক্ষা করে।

এভাবে বন উজাড় হতে থাকলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় জনপদ চরম দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়বে।

বনবিভাগের তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, “সরেজমিনে গিয়ে অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছি।

এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে।” তালতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অতীশ সরকার বলেন, “বন উজাড়ের বিষয়ে কয়েকবার বন বিভাগের কর্মকর্তাদেরকে সতর্ক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।