• ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ৩০শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

পাওনা টাকা চাওয়াই কাল হলো

বরিশালে যুবককে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত মে ১৮, ২০২৬, ১৯:২৮ অপরাহ্ণ
বরিশালে যুবককে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা

বিডি ক্রাইম ডেস্ক, বরিশাল॥ পাওনা টাকা ফেরত দেয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আল আমিন হাওলাদার (২৩) নামে এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বরিশালের মুলাদী উপজেলার সফিপুর ইউনিয়নের উত্তর বালিয়াতলী গ্রামে। হত্যার পর যুবকের দেহ পাশের একটি বিলে ফেলে রেখে খুনিরা পালিয়ে গেলেও স্থানীয় জনতা ও পুলিশের তৎপরতায় ৩ অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে।

রোববার (১৭ মে) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত আল আমিন উপজেলার দক্ষিণ বালিয়াতলী গ্রামের বাসিন্দা হানিফ হাওলাদারের ছেলে। পেশায় তিনি একজন সাধারণ ব্যবসায়ী ছিলেন বলে জানা গেছে।

নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় নোমান পণ্ডিত ও আজিজুল সরদারের কাছে কিছু টাকা পাওনা ছিল আল আমিনের। রোববার দুপুরে সেই পাওনা টাকা পরিশোধ করার কথা বলে আল আমিনকে বাড়ি থেকে ডেকে নেয় তারা। সরল বিশ্বাসে আল আমিন বাড়ি থেকে বের হলে তাকে একটি মোটরসাইকেলে তুলে উত্তর বালিয়াতলী গ্রামে নোমান পন্ডিতের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

অভিযোগ উঠেছে, নোমানের বাড়িতে আগে থেকেই ওত পেতে ছিল একদল সশস্ত্র ক্যাডার। আল আমিন সেখানে পৌঁছানো মাত্রই নোমান পন্ডিত, আজিজুল সরদার, কাওসার আকন ও শাহাবুদ্দিন ঘরামীসহ ৪-৫ জন দুর্বৃত্ত তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথমে লাঠিসোটা দিয়ে বেধড়ক মারধর এবং পরে ধারালো রামদা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। আল আমিনের আর্তচিৎকারে চারপাশ ভারী হয়ে উঠলেও খুনিদের মন গলেনি। একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সে নিস্তেজ হয়ে পড়লে, মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে খুনিরা তার দেহ পাশের একটি বিলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে গা-ঢাকা দেয়।

নিহতের ছোট ভাই আসিফ হাওলাদার অশ্রুসজল চোখে জানান, ভাইয়াকে ডেকে নেয়ার পর থেকেই আমাদের মনে একটা কু-ডাক দিচ্ছিল। দুপুরের দিকে স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী বিলে লাশ ফেলে দেয়ার দৃশ্য দেখে আমাদের ফোনে খবর দেন। আমরা বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে বিলে ছুটে যাই এবং কাদা-পানিতে মাখা রক্তাক্ত অবস্থায় ভাইকে উদ্ধার করি। দ্রুত মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলেন, ভাইয়া আর বেঁচে নেই, হাসপাতালেই আসার আগেই তার প্রাণ চলে গেছে।

হত্যাকাণ্ডের খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শত শত বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী লাঠিসোটা নিয়ে খুনিদের ঘেরাও করে। পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতা ধাওয়া দিয়ে মূল পরিকল্পনাকারী নোমান পণ্ডিত ও আজিজুল সরদারকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের গণধোলাই দিয়ে মুলাদী থানা পুলিশে সোপর্দ করে। এদিকে ঘটনার পরপরই সফিপুর তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ বিশেষ অভিযানে নামে এবং উত্তর বালিয়াতলী গ্রামে আত্মগোপনে থাকা শাহাবুদ্দিন ঘরামী নামে আরও এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

মুলাদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার মো. সোহেল রানা ঘটনার নির্মমতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত বর্বর। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় তিনজনকে আটক করতে সক্ষম হয়। নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

ওসি আরও যোগ করেন, প্রাথমিকভাবে আর্থিক লেনদেন ও পাওনা টাকাকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত বলে জানা গেছে। তবে এর পেছনে অন্য কোনো গভীর রহস্য আছে কি না, তা আমরা খতিয়ে দেখছি। এই ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত বাকি আসামিদের ধরতেও পুলিশের একাধিক টিম মাঠে অভিযান চালাচ্ছে।

আজ সোমবার (১৮ মে) ময়নাতদন্ত শেষে আল আমিনের মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিকেলে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করার প্রস্তুতি চলছে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর পুরো সফিপুর ইউনিয়ন জুড়ে চরম ক্ষোভ ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও নিহতের পরিবার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং খুনিদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।