জাকির হোসেন, আমতলী ॥ আমতলীতে লোহার সেতু ধসে বিয়ের যাত্রী পরিবহনকারী মাইক্রোবাস খালে পরে ৯জনের মর্মন্তি মৃত্যু হয়েছে। এঘটনায় ৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুর দেড়টার সময় উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের হলদিয়া এবং চাওড়া ইউনিয়নের মাঝখানে হলদিয়া হাট সংলগ্ন সেতু ধসে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত সবাই নারী এবং শিশু।
নিহতদের মধ্যে ৭জন মাদরীপুর জেলার শিবচরের বাসিন্দা এবং ২জন স্থানীয় হলদিয়া ইউনিয়নের গুরুদল গ্রামের। বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণ হানির ঘটনায় এলাকা জুরে শোকের ছায়া নেমে আসে।
জানা গেছে, আমতলী উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের গুরুদল গ্রামের মনির হাওলাদারের মেয়ে হুমায়রা বেগমের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল শুক্রবার।
ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মনির হাওলাদারের শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়রা মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা থেকে বেড়াতে আসেন। শনিবার দুপুরে মনির হাওলাদারের মেয়ে হুমায়রার শ্বশুর বাড়ি আমতলী পৌর শহরের ৩নং ওয়ার্ডে বৌভাতের উদ্দেশ্যে মাইক্রোবাস যোগে রওয়ানা হয়ে যান।
পথিমধ্য হলদিয়া হাট নামকস্থানে সেতু পাড় হওয়ার সময় সেতু ভেঙ্গে খালে পরে যান। এ সময় স্থানীয়রা দ্রুতে ঘটনাস্থলে এসে ৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করলেও বাকীরা ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
বাড়িতে আসেন শ্বশুর বাড়ির লোকজন দান শেষে শনিবার দুপুর দেড় টার সময় তারা মাইক্রো যোগে আমতলী আসছিল। পথিমধ্যে মাইক্রেটি হলদিয়া বাজার সংলগ্ন লোহার সেতু পার হওয়ার সময় মাঝ বরাবর ভেঙ্গে কচুরিপানায় ভরা খালে পরে তলিয়ে যায়।
মাইক্রোখালে পরে যাওয়ার শব্দ পেয়ে স্থানীয়রা উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসে। মুশল ধারে বৃষ্টি এবং খালে নেমে উদ্ধারের কোন সুযোগ না থাকায় উদ্ধার কাজে বিলম্ব ঘটনায় অনেকেই তখন পানিতেই প্রাণ হরান। মাক্রোটি পানির উপরে তোলার পর মধ্যে থেকে বেড়িয়ে আসে একের পর এক নারী শিশুসহ ৯টি লাশ।
৪জনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছে ৩জন। উদ্ধার হওয়া লাশ হলো শিবচর মাদরীপুরের ভেদর গঞ্জের আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী শাহনাজ আক্তার মুন্নী বেগম (৪০), তার ছোট মেয়ে তাহিয়া (৫), বড় মেয়ে তাসফিয়া (১১), একই এলাকার ফকরুল আহম্মেদ খান এর স্ত্রী ফরিদা বেগম (৫৫), সোহেল খানের স্ত্রী রাইটি (৩০), বাবুল মাদবরের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৪০), রফিকুল ইসলামের স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার রুবী বেগম (৫৫), হলদিয়া গ্রামের জহিরুল ইসলামের স্ত্রী জাকিয়া বেগম (৩) ও মেয়ে হৃদি (৫)।
জীবিত উদ্ধার হওয়া ৪জন হলেন, মাহবুব খান, সোহেল খান, সুমা আক্তার ও দীশা আক্তার তারা সবাই শিবচরের বাসিন্দা। হুমায়রা বেগমের নানা বাড়ি মাদরীপুরের শিবচর উপজেলার ভেদরগজ্ঞে।
সেখান থেকে নানা বাড়ির বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনরা বৃহস্পতিবার দুপুরে শিবচর উপজেলা থেকে মাইক্রো যোগে আমতলী আসেন। শুক্রবার ছিল ভাগ্নি হুমায়রার বিয়ে অনুষ্ঠান। বিয়ে অনুষ্ঠান শেষে তারা রাতে ওই বাড়িতে রাত্রিজাপন করেন। শনিবার সকালে তারা ভাগ্নির বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করে দুপুর ১ টার সময় ভাগ্নিজামাই বাড়ি আমতলীর অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য রওয়ানা করেন।
জীবিত উদ্ধার হওয়া মাহবুব খান বলেন, শুক্রবার আমরা ভাগ্নি হুমায়রা বেগমের বাড়ি হলদিয়া ইউনিয়নের গুরুদল গ্রামে যাই।
সেখান থেকে একটি হাইএস মাইক্রো যোগে আজ শনিবার দুপুর ১টার সময় ভাগ্নি জামাইর আমতলীর বাড়ির অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য রওয়ানা করি।
দুপুর দেড় টার সময় হলদিয়া বাজার সংলগ্ন একটি লোহার সেতু পার হওয়ার সময় মাইক্রোটি মাঝ বরাবর আসার পর আকস্মিক সেতুটির ২০ ফুট ধরে ধসে মাইক্রেসহ কচুরি পানায় ভর্তি খালে পরে যায়। এর পর আর কিছুই বলতে পারি না। জ্ঞান ফিরে দেখি হাসপাতালে ।
আল্লায় মোগো বাচাইলেও সব শ্যাষ অইয়া গ্যাছে। আরেক জীবিত মাহবুব খান বলেন, ৯জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে ৭জন আমাদের শিবচর মাদরীপুরের সবাই স্বজন। অন্য দুজন আমতলীর তারাও আমাদের অত্মীয়। সব শ্যাষ অইয়া গ্যাছে এর চাইতে আমাদেরও মইর্যা যাওয়া ভালো ছিল।
শনিবার দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, খালের দুই পারে হাজার হাজার মানুষ দাড়িয়ে রয়েছে। আর শুধু তারা অহাজারি করছে। হলদিয়া গ্রামের রাহেল বেগম কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আহারে কার মায়ের কোল এরহ খালি অইয়া গেলো। চন্দ্রা গ্রামের মস্তফা দালাল বলেন, মোরা খবর পাইয়া হেই হইতে এইহানে আছি।
এইরহম ভাবে ব্রীজটা ভাইঙ্গা এতগুলা মানুষ মইর্যা গেলো এই চোহে ক্যামনে দেখমু। হাসপাতাল ঘুরে দেখা গ্যাছে হাজার হাজার মানুষ এক নজর দেখার জন্য ভীর করছেন।
জীবিত স্বজনদের আহারির সঙ্গে স্থানীয়রা যেন চোখের পানি ফেলছেন সমান ভাবে। ডাক্তার সার্স সবাই যেন ব্যাথিত এদুর্ঘটনায়। মানুষের ভির ঠেলে তাদের চিকিসা দিতেও কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
হলদিয়া বাজার সংলগ্ন খালের উপর ২০০৭-২০০৮ সালে ৩০ লক্ষ টাকা ব্যায়ে লোহার সেতুটি নির্মানের পর কোন সংস্কার না করায় সেতুটি ছিল খুবই জরাজীর্ন এবং ঝুঁকিপূন।
দীর্ঘদিন ধরে সেতুটির সংস্কার না করায় লোহার এ্যাঙ্গেল এবং উপরের সিমেন্টের ঢালাই খুলে পরে যায়। স্থানীয়রা জোরাতালি দিয়ে কোন রকম চলাচল করলেও স্থাণীয় এলজিইডি এটি সংস্কার কিংবা নতুন করে নির্মানের কোন উদ্যোগে না নেওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় ঘটে বলে দাবী করেন স্থানীয়রা।
স্থাণীয় হলদিয়া ইউনিয়নের সদস্য সাইফুল ইসলাম স্বপন বলেন, কয়েকমাস আগেই সেতুটির দু’পাড়ে দুটি ভারী যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ সংক্রান্ত সাইনবোর্ড টানানো হয়।
কিন্তু কে বা কাহারা ওই সাইনবোর্ড সরিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া মাইক্রোবাস চালক দূরের হওয়ায় হয়তো সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ তা বুঝতে পারেনি।
আমতলী উপজেলা স্থাণীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঝুঁকিপূর্ন সেতু ভারী যানবহন চলাচল নিষেধ সম্বলিত সাইনবোর্ড টানানো ছিল।
সেতু ভেঙ্গে মাইক্রোবাসটি খালে পরে যাওয়ার পর আমরা খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধার কাজে নেমে পরি। ৪ জনকে জীবত উদ্ধার করা গলেও ৯জনের সলিল সমাধি ঘটে।
এত বড় দুর্ঘটনা এবং এতগুলো লাশ আমার জীবনেও আমি আর দেখি নাই। দুর্ঘটনার পর খবর পেয়ে আমতলী উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। আবহাওয়া এবং মুশলধারে বৃষ্টির কারনে উদ্ধার কাজ কিছুটা বিলম্ব হয়। ঘটনার খবর পেয়ে আমতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা এ্যাডেভোকেট এম কাদের, নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গোলাম সরোয়ার ফোরকান, আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) আমির হোসেন সেরনিয়াবাদ ওসি শাখওয়াত হোসেন তপু ঘটনাস্থলে থেকে উদ্ধার কাজ তদারকি করেন।
আমতলী উপজেলা ফায়ার সর্ভিসের স্টেশন ম্যানেজার (ওয়ার হাইজ ইন্সেপেক্টর) মো. হানিফ বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করি।
এ পর্যন্ত ৯টি নারী ও শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আরো লাশ আছে কিনা তা মাইক্রোটি উদ্ধার হলে বলা যাবে। বৈরী আবহাওয়া এবং জায়গার কারননে উদ্ধার কাজ কিছুটা বিলম্ব হয়। তবে দুর্ঘটনা কবলিত মাইক্রোটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এখনো উদ্ধার কাজ চলছে বলে জানান আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) তারেক হাসান।
দুর্গটনার পরপরই বরগুনার জেলা প্রশাসক মোহা: রফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন কালে বলেন, কি কারনে দুর্ঘটনা ঘটেছে বিষয়য়টি খতিয়ে দেখার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩ সদস্য বিষিষ্ট কমিটি গঠন করা হবে।
এবং এধরনের আরো যে ঝুঁকিপূর্ন সেতু রয়েছে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিয়ম অনুযায়ী পনিত পরিবার বর্গকে সহায়তা করা হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হোসেন হাসপাতাল পরিদর্শন করেন নিহতদের স্বজনদের সমবেদনা জানান। আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী শাখওয়াত হোসেন তপু ৯ জনের লাশ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ৩জন এখনো নিঁখোজ রযেছে। ৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
দূর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন কালে বরগুনা-১ আসনের সংসদস্য সদস্য গোলাম সরোয়ার টুকু বলেন, আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি।
এবং স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন সেতুটি নির্মান কালে অনিয়ম এবং দুর্নীতি করা হয়েছে। যে কারনে অল্প সময়ের ভিতরে সেতুিিট ধসে একটি মর্মান্তি দুর্গানায় ৯ জনের প্রাণ হারিয়েছি আমরা।
এঠি খুব দু:খজনক। তিনি আরো বলেন, সেতু নির্মানে অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ জানানো হয়েছে।