• ৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

বইন্যায় মোগো সব শ্যাষ কইরা হালাইছে

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত মে ২৯, ২০২৪, ২০:২৮ অপরাহ্ণ
বইন্যায় মোগো সব শ্যাষ কইরা হালাইছে

জাকির হোসেন, আমতলী॥ ‘বইন্যায় মোর সব শ্যাষ কইর‌্যা হালাইছে, বর ঠিক করতে এহন কুম্মে পামু টাহা পয়সা।’ রিমালের ছোবলে ধ্বংস হওয়া পানের বরজের দিকে তাকিয়ে অশ্রুসজল চোখে কথাগুলো বলছিলেন গুলিশাখালী ইউনিয়নের আঙ্গুলকাটা গ্রামের পান চাষী সাইদুল আকন।

সাইদুলের মত শত শত পান চাষী রিমালে তান্ডবে পানের বরজ হারিয়ে এখন পথের ফকির। আমতলী উপজেলার রিমালের ছোবলে অন্ত:ত দুই শতাধিক পানের বরজ ধ্বংস হয়েছে। আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের আঙ্গুলকাটা গ্রামের শাহজাহান আকনের ছেলে সাইদুল (৪০)।

বিভিন্ন এনজিওর নিকট থেকে ১০লক্ষ টাকা ঋণ করে এবং নিজের ৫লক্ষ টাকা পুঁজি খাটিয়ে বাড়ির পাশের ৫০ শতাংশ জমিতে এবছর পান চাষ করেন। পান চাষের লাভের থেকে এবছর একটি নতুন ঘর করার স্বপন্ন বুনছিলেন সাইদুল। স্বামী স্ত্রী এবং কৃষান রেখে দিন রাত বরজের পরিচর্যা করায় গাছে পান পাতাও ভালো হয়েছে।

আর কয়েকদিন গেলেই ছেড়া যেত পান। এর মধ্যেই ভয়াল রিমালে রাতের অন্ধকারে পানির বরজটি সম্পূর্ন মাটিতে ধসে পরে। সকাল বেলা পানের বরজে গিয়ে তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরার মতো অবস্থা হয়। দেখেন তার স্বপ্নের পানের বরজটি মাটিতে লুটিয়ে আছে।

বুধবার সাইদুলের সাথে কথা হয় তার পানের বরজে। কথা বলতে গিয়ে তিনি অঝোর ধারায় কাঁদছিলেন আর বলছিলেন এহন আমার কি হবে। আমার স্বপ্নই বা কোনহানে গ্যালো। কি দিয়াই বা দেনা হোধ করমু। ‘বইন্যায় মোর সব শ্যাষ কইর‌্যা হালাইছে, বর ঠিক করতে এহন কুম্মে পামু টাহা পয়সা।

গুরাগারা লইয়া খামু কি হেই চিন্তায় আছি।’ তিনি আরো বলেন, পান পাতা মাডিতে পইর‌্যা যাওয়ায় এহন একটি দেওইর পানি লাগলেই পাতা পইচ্যা যাইবে। সাইদুলের মত এই গ্রামের মস্তফা হাওলাদারের ছেলে মেলিন হাওলাদারের ৫০শতাংশ, শাহিন সিকদারের ২০ শতাংশ, ফোরকান হাওলাদারের ৫০ শতাংশ খালের আকনের ছেলে দেলোয়ার আকনের ৫০শতাংশ, রুস্তুম মুন্সির ছেলে ইউসুব মুন্সীর ৫০ শতাংশ,আব্দুর রব মুছল্লীর ২৫ শতাংশ ডালাচারা গ্রামের আক্কাচ হাওলাদার ১৫ শতাংশ,

রফিক গাজী ৩০ শতাংশ, সোহরাব হাওলাদার ৩০ শতাংশ, সিদ্দিক হাওলাদার ২০ শতাংশ, লোকমান গাজী ৩৫ শতাংশ, একই ইউনিয়নের দক্ষিণ গুলিশাখালী গ্রামের শাহআলী আকনের ৫০ শতাংশ কাঞ্চন হাওলাদারের ৫০ শতাংশ, সুবল মিস্ত্রীর ৩০ শতাংশ, চানমিয়া গাজীর ৫০ শতাংশ, রতন মিস্ত্রীর ৪০ শতাংশ, গুলিশাখালী গ্রামের আক্কাছ মৃধার ৪০ শতাংশ সনাতন মিস্ত্রীর ৩০ শতাংশ, মজিদ প্যাদার ১০ শতাংশ, খেকুয়ানি গ্রামের আলামিন হাওলাদারের ২৫ শতাংশ, কবির হাওলাদারের ৫০ শতাংশ,

মালেক সিকদারের ৫৫ শতাংশ, আব্দুল মন্নান হাওলাদারের ২০ শতাংশ, চাওড়া ইউনিয়নের ঘটখালী গ্রামের আক্কাাচ হাওলাদারের ২০ শতাংশ, কনু ঘরামীর ২৫ শতাংশ, রুহুল আমিন হাওলাদারের ২০ শতাংশ, দুলাল মৃধার ২৫ শতাংশ জমির পানের বরজ সম্পূর্ন ধ্বংস হয়েছে।

এছাড়া আমতলীর সদর ইউনিয়নের উত্তর টিয়াখালী, টিয়াখালী, মানিকঝুরি, চলাভাঙ্গা, হলদিয়া ইউনিয়নের চিলা, টেপুরা, উত্তর তক্তাবুনিয়া, রাওঘা, কাঠালিয়া, আঠারগাছিয়া ইউনিয়নের সোনাখালী, গাজীপুর, কুকুয়া ইউনিয়নের রায়বালা, কৃষ্ণনগর, হরিমৃতজ্ঞয়, চাওড়া ইউনিয়নের পাতাকাটা, চন্দ্রা, আরপাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের তারিকাটা, ঘোপখালী, পাতাকাটাসহ শতাধিক গ্রামে পান চাষ হয়ে থাকে।

সবচেয়ে বেশী পান চাষ হয় গুলিশাখী গ্রামে। বুধবার সকালে গুলিশাখালীর ইউনিয়নের আঙ্গুলকাটা, ডালাচারা, দক্ষিণ গুলিশাখালী, খেকুয়ানি এবং চাওড়া ইউনিয়নের ঘটখালী ও পাতাকাটা গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, শত শত পানের বরজ রিমালের ছোবলে ধ্বংস হয়ে মাটিতে এলামেলো হয়ে পরে আছে।

পাশেই পরে আছে চ’র্ন বিচ’র্ন পাঠ খড়ি। হতাশা নিয়ে চাষীরা অসহায়ের মত ধ্বংষ হওয়া পানের বরজের গাছ, পাটখরি গোছানোর কাজ করছেন। অনেকের চোখ তখন অশ্রু সজল অবস্থায় দেখা গেছে। দক্ষিণ গুলিশাখালী গ্রামের শাহ আলী আকন কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, ‘দ্যাহেন দ্যাহেন স্যার মোর পানের বরের কি ক্ষতি অইছে। মুই ধার দেনা হইর‌্যা ১২-১৩ লাখ টাহা খরচ কইর‌্যা এই পান চাষ হরছি।

এহন বইন্যায় পান গ্যাছে টাহাও গ্যাছে।’ ডালাচারা গ্রামের রফিক গাজী বলেন,‘ মুই সব টাহা দেনা কইর‌্যা এই বর হরছি। এহন বইন্যায় সব মাডিতে গ্যাছে এহন আমি এইয়া হারাইতে টাহা পামু কই। কেডা মোরে টাহা দেবে। এহন পলাইয়া ঢাহা যাওন ছাড়া আর কোন উপায় নাই।

ঘটখালী গ্রামের আক্কাছ হাওলাদার বলেন,‘মোর বর সব ভাইঙ্গ চুইর‌্যা শ্যাষ অইয়া গ্যাছে। এহন যে মানুষ লইয়া ঠিক হরমু হেই টাহা ধার ছাইছি হেও পাইনা। এহন আল্লায় যা হরে। সরকার যদি টাহা দেয় হ্যালে বর হারাইতে পারমু।’ তিনি আরো বলেন এই বর আর খারা করা যাইবে না।

সব পাতা পইচ্যা যাইবে। এই গ্রামের আরেক চাষী কালাম হাওলাদার বলেন, ২০-২৫ লক্ষ টাকা খরচ কইর‌্যা পান চাষ করছি। টাহাও গ্যাছে পানও গ্যাছে। এহন কান্দি না। কাইন্দা আর কি অইবে।

গুলিশাখালী ইউনিয়নের চেয়ারসম্যান এ্যাডভোকেট মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, আমতলী উপজেলার মধ্যে গুলিশাখালী ইউনিয়নের সবচেয়ে বেশী পান চাষ হয়ে থাকে। কৃষকরা ধারদেনা পান চাষ করে থাকে। রিমালের ছোবলে এই ইউনিয়নের অধিকাংশ চাষীর পানের বরজ মাটিতে মিশে গেছে।

তাদেরকে যদি পুন:বাসন করা না হয় তাহলে তাদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে যাবে। এবং দেনার ভয়ে দেশ ছাড়থে হবে। আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইছা বলেন, আমতলী উপজেলায় ১৫৮ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে।

এর মধ্যে গুলিশাখালী ইউনিয়নে সর্বাধিক চাষ হয়ে থাকে। রিমালের তান্ডবে প্রায় দুই থেকে আড়াই শতাধিক পানের বরজ ধ্বংস হওয়ায় পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমরা ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করছি। তিনি আরো বলেন, ৪৪৫ হেক্টর জমির সবজী এবং ২২০ হেক্টর জমির আউষের বীজতলা নষ্ট হয়েছে।

আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, রিমেলের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত পানচাষীদের তালিকা তৈরীর কাজ চলছে। কৃষি পুন:বাসন কর্মসূচীর আওতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের পুন:বাসন করা হবে।