• ৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৬ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

দুর্যোগে অরক্ষিত দক্ষিণের উপকূল

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত জুন ১, ২০২৬, ১৮:৩৪ অপরাহ্ণ
দুর্যোগে অরক্ষিত দক্ষিণের উপকূল

বিডি ক্রাইম ডেস্ক, বরিশাল॥ বছরের পর বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর নদীভাঙনের মুখোমুখি হওয়া বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় জেলাগুলোর লাখো মানুষের চোখে দুর্যোগকালীন নিরাপদ আশ্রয়ের আকুতি যেন নিত্যদিনের।

সরকারি তথ্য বলছে, বিভাগে প্রায় সাড়ে তিন হাজার সাইক্লোন শেল্টার থাকলেও, দুর্যোগের মুহূর্তে উপকূলের প্রায় ৭৫ ভাগ মানুষই রয়ে যাচ্ছেন পুরোপুরি অরক্ষিত।

কাগজে-কলমে এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ২৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতার হিসাব দেখানো হলেও, বাস্তবে অধিকাংশ ভবনই জরাজীর্ণ, ব্যবহারঅনুপযোগী এবং তীব্র পানিসংকটে নাকাল।

সরজমিনে বরিশাল সদর উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের সিংহেরকাঠি বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় সাইক্লোন শেল্টারে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দশা। ভবনটির দেয়াল ও ছাদ জরাজীর্ণ। ভবনে পাইপলাইনের সংযোগ থাকলেও নেই কোনো পানির কল।

দুর্যোগের সময় এই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া টুঙ্গীবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল খালেক ক্ষোভ প্র‍কাশ করে বলেন, দুর্যোগের সময় প্রাণের ভয়ে আশ্রয়কেন্দ্র‍ে ছুটি আসি। কিন্তু এখানে থাকার পরিবেশ নেই, জানালার কাঁচ ভাঙা। সবচে বড় সমস্যা পানির। সংযোগ আছে কিন্তু কল নেই।

একই ইউনিয়নের গৃহিণী ফাতেমা বেগম বলেন, ​নদী এক্কেরে আমাগো ঘরের দুয়ারে। সামান্য দুর্যোগ হইলেই সব তলাইয়া যায়। এলাকায় দুইডা আশ্র‍য়কেন্দ্র‍ আছে, হেইডাও থাকার মতো না। পোলাপান আর গরু-বাছুর লইয়া কই যামু, হেই চিন্তায় রাইতে ঘুম আহে না।

উপকূলের কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বরগুনার উত্তর ডালভাঙ্গা, লতাবাড়িয়া আর মাঝখালি, এই তিনটি গ্রামে আজ পর্যন্ত কোনো সাইক্লোন শেল্টারই গড়ে ওঠেনি।

​মাঝখালি গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন বলেন, ​’আমাগো গ্রামে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র‍ নাই। ঝড় আইলে পোলাপান লইয়া পাশের গ্রামে দৌড়াইতে হয়। কিন্তু গাঙের পানি বাড়লে তো রাস্তাঘাট থাহে না, যামু কই?’

অন্যদিকে, দ্বীপজেলা ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার ২১টি চরের মধ্যে ৬টিতেই কোনো সাইক্লোন শেল্টার বা মাটির কিল্লা নেই। ঢালচর কিংবা চর লাদেনের মতো প্রত্যন্ত চরের অর্ধলক্ষাধিক মানুষের দুর্যোগের সময় একমাত্র ভরসা খড়কুটো আর গোলপাতার তৈরি নাজুক কাঁচা ঘর।

​ভোলার ঢালচরের বাসিন্দা মরিয়ম বিবি বলেন, ​চারদিকে শুধু নদী আর পানি। ঝড় উঠলে এই খড়কুটোর কাঁচা ঘরে পোলাপান জড়াজড়ি করে আল্লাহর নাম লওয়া ছাড়া কোন উপায় নাই।

এদিকে ​বরিশাল জেলায় ৬৪০টি সাইক্লোন শেল্টার থাকলেও তা জনসংখ্যার তুলনায় একেবারেই কম। খোদ বরিশাল জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রনজিৎ কুমার সরকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘বরিশাল জেলায় যে কটি সাইক্লোন শেল্টার থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা যে কম।

অনেকগুলো ভবন পুরনো হয়ে গেছে, যেখানে পানিসংকটসহ কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। আমরা জরাজীর্ণ সাইক্লোন শেল্টার ও মাটির কেল্লাগুলোর তালিকা তৈরি করছি। এগুলো দ্রুত সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

এবিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমান জানান, উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

একই সাথে বিদ্যমান জরাজীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলো দ্রুত সংস্কার করতে আমরা কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছি। আশা করি দ্রুতই এর বাস্তবায়ন শুরু হবে।

বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, বরিশাল বিভাগে সাইক্লোন শেল্টারের সংখ্যা ৩৪৯৩টি এবং মাটির কিল্লা রয়েছে ৭০টি।