• ২৫শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ৫ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

লঞ্চ যাত্রীর নিরাপত্তায় নেই অস্ত্রধারী আনসার

admin
প্রকাশিত মে ২৯, ২০১৯, ১৬:৩১ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ঢাকা বরিশাল রুটের বৃহত্তর ও বিলাসবহুল ২৫ টি লঞ্চে ৮ ঘন্টার রাত্রীকালীন যাত্রায় দৈনিক ৩০ হাজার যাত্রীর নিরাপত্তায় নেই কোন অস্ত্রধারী আনসার সদস্য। হাজার হাজার যাত্রী নগদ অর্থসহ মূল্যবান মালামাল নিয়ে প্রতিনিয়ত লঞ্চে চলাচল করলেও তাদের জানমালের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য নিয়োগ দিচ্ছেন না মালিক কর্তৃপক্ষ। সবশেষ বেতন স্কেলে আনসার সদস্যদের বেতন বৃদ্ধি পেলে লঞ্চ থেকে আনসার প্রত্যাহার করেন লঞ্চ মালিকরা। এরপর থেকে তারা লঞ্চ কর্মচারীদের আনসারের পোশাক পরিয়ে যাত্রীদের চোখে ধুলো দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিজস্ব উদ্যোগে লঞ্চকর্মী থেকে নিরাপত্তাকর্মী বানানো হয়েছে। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেই। পথে লঞ্চে ঝামেলা বাঁধলে তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও নেই। তাদের হাতে অস্ত্রের পরিবর্তে থাকে লাঠি। এ কারণে এবারের ঈদ উৎসবে নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে বাড়ি ফিরতে হবে যাত্রীদের। অথচ বরিশাল আধুনিক নৌ-বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে আনসার সদস্যের নির্দেশনা থাকলেও মানছে না লঞ্চ মালিকপক্ষ। এনিয়ে বন্দরটির উপ-পরিচালক আজমল হুদা মিঠু বলেন, শুধু ঈদ উপলক্ষে নয়, লঞ্চে যাত্রী নিরাপত্তার ব্যাপারে ১২ মাসই মালিক পক্ষের উপর নির্দেশনা দেয়া থাকে। তার মধ্যে রয়েছে যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেট ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা সংযুক্ত, সতর্ককরন মাইকিং ব্যবস্থা এবং আনসার বাহিনী কর্তৃক নিরাপত্তা বাস্তবায়ন করা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৃহত্তর ঢাকা-বরিশাল নৌ-রুটে ২০ থেকে ২৫টি লঞ্চে প্রায় ৩০ হাজার যাত্রী আসা যাওয়া করে। দীর্ঘ ৮ থেকে ১০ ঘন্টা এসব যাত্রীদের লঞ্চে অবস্থান করতে হয়। এরমধ্যে যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি রয়েছে একেবারে নড়বড়ে অবস্থায়। এতে বছরের একাধিকবার বিভিন্ন লঞ্চে ঘটে চলছে হাত্যাসহ নানা অপকর্মের ঘটনা। পাশাপাশি কিছু দুর্বৃত্ত লঞ্চে যাত্রীদের মালামাল চুরি, ছিনতাই, মলম দিয়ে অজ্ঞান করে মালামাল নিয়ে যাওয়াসহ যাত্রীদের বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত, কেবিনে হত্যা ও ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটিয়ে চলছে। যা প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জানা রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে সরকারের আনসার বাহিনী নিয়োগ করার কথা বললেও লঞ্চ মালিক কর্তৃপক্ষ ব্যয় বেশি হবে ভেবে সরকারি আনসার নিয়োগ না দিয়ে পাবলিক নিরাপত্তা কর্মী দিয়েই ঢিলেঢালাভাবে নিরাপত্তা দিচ্ছে। আনসার সদস্যদের বেতন পূর্বে ছিল ৮ হাজার ৭শ’ টাকা। বর্তমান সরকার বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করায় এই বেতন ১৩ হাজার ৫০ টাকা হওয়ায় লঞ্চ মালিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আনসার প্রত্যাহার করে নেন। লঞ্চ মালিক প্রতিনিধিরা আরো জানান, বর্তমানে আনসার না থাকায় যাত্রীরা পূর্বের চাইতে ভালো নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে। প্রতিটি লঞ্চের মালিক নিজস্ব সিকিউরিটি নিয়োগ দিয়ে যাত্রীদের নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে অনেক যাত্রীর সাথে আলাপকালে তারা জানান, লঞ্চে অস্ত্রধারী আনসার থাকার প্রয়োজন রয়েছে। লাঠি ব্যবহার করা সিকিউরিটি দিয়ে তেমন কাজ হচ্ছে না এবং নৌপথে যাত্রীদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। এ ব্যাপারে লঞ্চ মালিক সমিতি আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোঃ ফেরদৌস বলেন, সরকারি শর্তাবলী মেনে বেতন ভাতাদি দিয়ে লঞ্চে আনসার সদস্য আনতে গেলে ব্যয় বেড়ে যায়। কারন লঞ্চে যাত্রী সমাগম আগের মতো নেই। শুধু কেবিনগুলোতে যাত্রী থাকে, ডেকে তেমন যাত্রী হয়না। এছাড়া বিভিন্ন মৌসুমে ঝটিকা যাত্রী সমাগত হওয়ায় ব্যয় ও লাভের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে। নিয়মিত লাভ হলে সরকারি আনসার সদস্য ভাড়া নেয়া যেতো। কিন্তু তার বিকল্প হিসেবে আমরা আউটসোর্সিং এর জনবল দিয়ে গার্ডের কাজ চালিয়ে নিচ্ছি। অপরদিকে এ ব্যাপারে বরিশাল জেলা প্রশাসক এস.এম অজিয়ার রহমান বলেন, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী মিটিংএ এটি আলোচনা করা হবে। এনিয়ে একাধিক ভুক্তভুগী যাত্রী বলেন, একসময় ঢা-বরিশাল রুটের লঞ্চগুলোতে আনসার সদস্যরা ডিউটি করতো লঞ্চের গেট থেকে একদম ছাদ পর্যন্ত এবং রাতে তারা পালাক্রমে নিচতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত ডিউটি করতো। এতে যাত্রীরা বিশেষ নিরাপত্তাবোধ করতো। যাত্রীদের মধ্যে শৃঙ্খলাও ছিলো। আর এখন বছরজুড়ে লঞ্চগুলোর কেবিনে হত্যাকান্ড ও মাদক পাচারের ঘটনা ঘটছে। যা নৌ-পুলিশ ও কোতয়ালী পুলিশ বিগত দিনে উদ্ধার করেছে। শুধু তাই নয় লঞ্চে ছিনতাই ও পকেটমার ব্যাগ ও লাগেজ চুরিও বেড়েছে কিন্তু আনসার সদস্যরা ডিউটি করার কারনে আগে এমনটা হয়নি। শুধু তাই নয়, আগে লঞ্চে যাত্রীবেশে সন্দেহজনক কেউ উঠলে আনসার সদস্যরা তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতো এবং তাদের পক্ষে বুঝতে পারাও সম্ভব হতো। কিন্তু এখন আনসার সদস্যরা না থাকায় যাত্রী বেশে দুস্কৃতিকারী উঠলে লঞ্চ কর্তৃপক্ষও কিছু করতে পারছে না। এছাড়া প্রশাসনের কোন সদস্য ছাড়া সরাসরি কোন ব্যক্তিকে তারা চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতাও রাখেনা। এসুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা। সুত্রে আরো জানা গেছ, চলতি বছরেই ঢাকা থেকে বরিশালগামী লঞ্চ থেকে ইয়াবার বড় চালান উদ্ধারসহ একটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। বৃহত্তর এলঞ্চগুলোতে বিপুলসংখ্যক যাত্রীর নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্য না থাকার ব্যাপারে আনাসার ভিডিপির বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক বলেন, লঞ্চ মালিকদেরকে চিঠি দেয়া হলেও তারা চাহিদা না দেয়ায় লঞ্চে আনসার সদস্য প্রদাণ করা সম্ভব হচ্ছেনা। তবে লঞ্চ মালিকরা তাদের লঞ্চে যাত্রীদের নিরাপত্তায় যদি আনসার চান, তাহলে জেলা অ্যাডজুডেন্ট অফিস থেকে আনসার দেয়া যেতে পারে। তারা সরকারের সাথে চুক্তি করে অগ্রিম টাকা দিলে আনসার পাবে। গত ৩ বছর যাবৎ লঞ্চ মালিকরা সরকারি বেতন বৃদ্ধি পাবার পর থেকে আনসার প্রত্যাহার করে নেয়। তবে নৌপথের উপর যেভাবে মানুষের আস্থা বেড়েছে, সেই আস্থা টিকিয়ে রাখতে লঞ্চে আনসারের ডিউটি থাকা একান্ত প্রয়োজন।