নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ একদিকে দফায় দফায় পুলিশী অভিযান-তল্লাশী ও গনগ্রেফতার আর অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বাধা, হামলা, ভাংচুর, মারধোর সবমিলিয়ে ভোটের মাঠে টিকতেই পারছেনা বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট। বরিশালের ২১ নির্বাচনী এলাকার প্রায় সবকটিতেই চলছে এমন পরিস্থিতি। প্রচার-প্রচারনায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাতো দূরের ব্যাপার, এমনকি প্রকাশ্যে গনসংযোগে পর্যন্ত নামতে পারছেনা দলটির নেতা-কর্মীরা। প্রার্থীদের অনেকে পর্যন্ত হয়ে আছেন অবরুদ্ধ। আনুষ্ঠানিক প্রচার প্রচারনা শুরু হওয়ার পর থেকে সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন ধানের শীষের অন্ততঃ ৬ প্রার্থী। এদের মধ্যে বেদম পিটিয়ে একজনের পা’ ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। গুরুতর অবস্থায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কেবল ক্ষমতাসীন দলই নয়, মহাজোটের অংশীদার দল জাতীয় পার্টির দুই প্রার্থী নাসরিন জাহান রতœা আমিন এবং ডাঃ রুস্তম আলী ফরাজীর কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধেও উঠেছে বেপরোয়া হামলা ভাংচুর মারধোরের অভিযোগ। এক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকা বরিশাল-৬’এ ব্যাপক সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করার অভিযোগ উঠেছে জাপা’র সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের পতœী রতœা আমিনের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ অবশ্য স্বীকার করেনি ক্ষমতাসীন দল তথা মহাজোটের শরীক দলগুলোর নেতারা। মনোনয়ন নিয়ে অভ্যন্তরীন কোন্দলের জেরে বিএনপি নিজেরাই নিজেদের উপর হামলা ভাংচুর চালিয়ে ক্ষমতাসীন দলের উপর দায় চাপাচ্ছে বলে দাবী তাদের। গত ১০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারনা শুরু হওয়ার পর থেকেই পুলিশ কর্তৃক গণগ্রেফতার এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের দ্বারা হামলা মারধোর নির্বাচনী অফিস এমনকি বাড়ি-ঘর পর্যন্ত ভাংচুরের অভিযোগ করতে থাকেন বিভিন্ন আসনে থাকা বিএনপি’র প্রার্থীসহ দলটির নেতা-কর্মীরা। কিছু কিছু জায়গায় ভোটের মাঠে ভাল অবস্থানে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও করেন একই অভিযোগ। বৃহস্পতিবার বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনের বিভিন্ন এলাকায় সিংহ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ফারুক তালুকদারের অন্ততঃ ১০টি নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুরের অভিযোগ আনা হয় মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রতœা আমিন এবং তার স্বামী রহুল আমিন হওলাার ও তাদের কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে। জেলা পুলিশ সুপারের কাছে দেয়া এক লিখিত অভিযোগে প্রার্থী মোহাম্মদ আলী তালুকদার ফারুক বলেন, ‘প্রার্থী এবং তার স্বামী দাড়িয়ে থেকে ক্যাডার বাহীনি দিয়ে আমাদের নির্বাচনী ক্যাম্পগুলো ভাংচুর করাচ্ছে।’ প্রার্থী রতœা আমিনের বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ সেখানকার বিএনপি প্রার্থী সাবেক এমপি আবুল হোসেন খান’র। প্রচার প্রচারনা শুরুর পর থেকেই লাঙ্গল প্রতীকে ভোট করতে নামা মহাজোটের এই প্রার্থীর ক্যাডার বাহীনি নির্বাচনী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে বলে অভিযোগ তার। নির্বাচনী এলাকার কোথাও বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা প্রচার প্রচারনায় নামতে পারছেন না অভিযোগ করে আবুল বলেন, ‘দফায় দফায় হামলা মারধোরের শিকার হচ্ছে ধানের শীষের নেতা-কর্মীরা। আমাদের অন্ততঃ ১২টি নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর করেছে রতœা আমিনের ক্যাডার বাহীনি। এসব বিষয়ে পুলিশে অভিযোগ করেও কোন লাভ হচ্ছেনা।’ পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বাকেরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘রতœা আমিনের মনোনয়ন মানতে পারেননি এখানকার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। তারা চেয়েছিল নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। সিংহ প্রতীকে নির্বাচনে নামা ফারুক তালুকদার আওয়ামী লীগের লোক। তার স্ত্রী পারভিন তালুকদার একসময় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। ফলে দলের বহু নেতা-কর্মী মাঠে নেমে সিংহ’র পক্ষে কাজ করছেন। মূলতঃ একারনেই দিশেহারা হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারনায় বাধা দেয়াসহ তার ক্যাম্পগুলো ভাংচুর করা হচ্ছে।’ এবিষয়ে কথা বলার জন্যে রতœা আমিনের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি তা ধরেননি। রতœা আমিনের পাশাপাশি মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির আরেক নেতা পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ রুস্তুম আলি ফরাজীর বিরুদ্ধে উঠেছে সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ। পেশাগত দায়িত্ব পালনে মঠবাড়িয়ায় গিয়ে রুস্তম আলী ফরাজীর কর্মীদের হামলায় আহত ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সাংবাদিক তামিম সরদার বর্তমানে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) সাবেক এমপি বিলকিস জাহান শিরিন বলেন, ‘দক্ষিনাঞ্চলে থাকা ২১টি নির্বাচনী এলাকার কোথাও প্রচার-প্রচারনা চালাতে দেয়া হচ্ছেনা আমাদের। নেতা-কর্মীরা পথে নামলেই হয় তাদেরকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ নয়তো নৃশংস হামলা চালিয়ে হাত পা ভেঙ্গে হাসপাতালে পাঠাচ্ছে আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহীনি। এমন একটি নির্বাচনী এলাকা নেই যেখানে স্বাভাবিক প্রচার প্রচারনা চালাতে পারছি আমরা।’ বরিশাল জেলা বিএনপি’র (দক্ষিন) সাধারন সম্পাদক এ্যাড. আবুল কালাম শাহিন বলেন, ‘এ পর্যন্ত বরিশাল-৫ নির্বাচনী এলাকায় আমাদের প্রায় ৪৫ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রতি রাতে হানা দেয়া হচ্ছে নেতা-কর্মীদের বাড়ি। তল্লাশীর নামে তছনছ এমনকি ভাংচুর পর্যন্ত করা হচ্ছে আসবাবপত্র।’ বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক নূরুল আলম রাজু বলেন, ‘১৯ ডিসেম্বর বুধবার বরিশাল-৪ নির্বাচনী এলাকার পাতারহাটে গনসংযোগে গেলে ধানের শীষের প্রার্থী নূরুর রহমান জাহাঙ্গীর’র উপর হামলা চালায় নৌকার প্রার্থী সংসদ সদস্য পঙ্কজ দেবনাথের ক্যাডার বাহীনি। বেদম মারধোরে ভেঙ্গে দেয়া তার বাম পা। বর্তমানে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। শুক্রবার নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বরিশালে এলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা জানাতে ভাঙ্গা পা নিয়ে স্ট্রেচারে শুয়ে তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। কিন্তু জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাকে দেখা করতে দেননি।’ পিরোজপুর জেলা বিএনপি’র সাধারন সম্পাদক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘পিরোজপুর-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট যুদ্ধে নেমেছেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী। কিন্তু হামলা মামলা গ্রেফতারের ভয়ে প্রকাশ্য প্রচার-প্রচারনায় নামতে পারেননি তিনি।’ স্বরুপকাঠী উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি আমাদের। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের কার্যালয় তালাবদ্ধ করে রাখে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা।’ ঝালকাঠী-২ (ঝালকাঠী সদর-নলছিটি) আসনের বিএনপি প্রার্থী জীবা আমিন খান বলেন, ‘এ পর্যন্ত ৩ বার আমার গাড়ী বহরে হামলা হয়েছে। এমনকি আমার প্রাননাশের চেষ্টা পর্যন্ত হয়েছে।’ বরিশাল-১ আসনের প্রার্থী জহিরুদ্দিন স্বপন বলেন, ‘প্রতিদিন একটা করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ২৪ ঘন্টায় আমাদের কতজন নেতা-কর্মীর বাড়ি-ঘর ভাংচুর হল কিংবা কতজন হামলার শিকার হলেন তা জানাচ্ছি আমরা। পুলিশ প্রশাসনকেও বলছি। কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেয়া তো হচ্ছেই না উপরন্ত গায়েবি মামলায় গ্রেফতার হচ্ছে আমার কর্মী সমর্থকরা। পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের বিএনপি প্রার্থী এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমাদের ৪০ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গনসংযোগ কিংবা প্রচার-প্রচারনায় নামলেই হামলা মারধোর আর গ্রেফতারের শিকার হতে হচ্ছে।’ পটুয়াখালী-২ আসনের প্রার্থী সালমা আলম বলেন, ‘প্রায় প্রতিরাতে বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেয়া হচ্ছে।’ বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের প্রার্থী সরফুদ্দিন সান্টু বলেন, ‘এপর্যন্ত ৩ বার ঘটেছে আমার গাড়ি বহরে হামলার ঘটনা। গ্রেফতার করা হচ্ছে আমার নেতা-কর্মীদের।’ ঝালকাঠী-১ (রাজাপুর-কাঠালিয়া) আসনের প্রার্থী বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর বলেন, ‘আমরা তো কোন দল কিংবা প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করছিনা। আমাদের প্রতিপক্ষ যেন পুলিশ। ভোটের মাঠে তারা আমাদের যেভাবে বাঁধা দিচ্ছে তাতে মনে হয় যেন তারাই আমাদের প্রতিপক্ষ।’ পটুয়াখালী-৩ আসনের প্রার্থী গোলাম মাওলা রনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বে ভোগা আওয়ামী লীগ’র যদি সত্যিকারের জনসমর্থন থাকতো তাহলে তো আমাদের প্রচার প্রচারনায় বাধা দেয়ার দরকার হতনা। কেবল আমি নই, আমার স্ত্রী’র গাড়িতে পর্যন্ত হামলা ভাংচুর চালানো হয়েছে। সেই সাথে ব্যবহার করা হচ্ছে পুলিশ।’ বরিশাল-৫ (সদর) আসনের প্রার্থী বিএনপি’র যুগ্ম-মহাসচিব সাবেক এমপি মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, এভাবে গণগ্রেফতার আর হামলা মারধোরের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করছে। সাধারন মানুষ দেখছে যে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে ক্ষমতাসীন দল কতটা আতঙ্কে আছে। তাইতো পুলিশকে ব্যবহার এবং হামলা ভাংচুর মারধোরের মাধ্যমে মাঠ খালি করে এক তরফা নির্বাচন করতে চাইছে তারা। তবে এসব ঘটনায় বিএনপি’র ভোট বাড়াই কেবল নয়, জনসাধারনও আওয়ামী লীগের দিক থেকে তাদের মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।’ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আওয়ামী লীগের বরিশাল জেলা সাধারন সম্পাদক সংসদ সদস্য এ্যাড. তালুকদার মোঃ ইউনুস বলেন, ‘মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্বে নিজ দলের মহাসচিব’র উপর হামলা করতে পারে যে দলের নেতা-কর্মীরা সেই দলে অভ্যন্তরীন কোন্দলের কারনেই যে এসব ঘটছে তা আর কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবেনা। এসব করে আওয়ামী লীগের উপর দায় চাপিয়ে তারা ভোটের মাঠে সুবিধা নিতে চাইছে। কিš‘ তাতে কোন লাভ হবেনা। ৩০ তারিখ জনগনের ভোটে জিতেই আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় যাবে।’