তানজিল জামান জয়,কলাপাড়া ॥
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বর্ণা ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সমাপ্তি দুই মাস ১৮ দিন ধরে ঘর ছাড়া। পিতৃহীন এ দৃই বোনসহ তাদের মা বাসন্তী রানীকে (৩০) ঘরে ঢুকতে দিচ্ছেনা তাদের কাকা সমির হাওলাদার। এ কারনে মাকে নিয়ে দুই মেয়ে এখন মামা বিপুল গাইনের বাসায় আশ্রয় নিলেও নিজ ঘরে আদৌ ফিরতে পারবে কীনা এ শঙ্কায় দেখা দিয়েছে। প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর থেকে এসে স্কুলের পরীক্ষায় এ দু’বোন অংশ নিলেও বন্ধ হয়ে গেছে তাদের বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নিজকাটা গ্রামের মৃত দেবরঞ্জন হাওলাদারের মেয়ে স্বর্ণা ও সমাপ্তি তাদের পিতৃগৃহে ফিরতে না পাড়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে তাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষত।
২০১৯ সালের ৮ মে বিকালে স্বামীর ভিটা থেকে উচ্ছেদের জন্য বাসন্তী রানী ও তার দুই মেয়েকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে দেবর সমির হাওলাদার ও প্রতিবেশি পুতুল রানী। ঘর থেকে চুলের মুঠি ধরে বের করে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে ও দা দিয়ে মাথায় কোপ দিয়ে রক্তাক্ত জখম করে বাসন্তী রানীকে। ছিনিয়ে নেয় স্বামীর শেষ স্মৃতি গলার চেইন। মাকে বাঁচাতে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে স্বর্ণাসহ প্রতিবেশি শোভা রানী, সুব্রত, অনামিকা এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করে জখম করে। ওইদিনই তাদের কলাপাড়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় ৯ মে কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দুই জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করে। আদালত কলাপাড়া থানার ওসিকে মামলাটি এজাহার হিসেবে নেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। এ মামলা দায়ের করার পর থেকে ঘর ছাড়া বাসন্তী রানী ও তার দুই মেয়ে।
পাখিমারা প্রফুল্ল ভৌমিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী স্বর্ণা জানায়, মাসহ আমাদের মারধর করার মামলা করার পর থেকে তাদের ঘরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছেনা। কখনও রাতে মামার বাসায়, কখনও মাসির বাসায় তাদের রাত কাটাতে হচ্ছে। সামনে পরীক্ষা, কিন্তু এতো দূরে থেকে স্কুলে যেতে পারছে না। বন্ধ রয়েছে কোচিং ও প্রাইভেট। দুই বোনই স্কুলের পরীক্ষায় অংশ নিলেও মায়ের উপর নির্যাতনের ঘটনা মনে পড়লে ও তার চোখের জল দেখে পড়ায় মনোযোগী হতে পারছি না। যেখানে ঘরে ঢুকতে পারছি না,সেখানে অন্যের বাসায় গিয়ে পড়ব কীভাবে। দু’ মুঠো ভাত ও আশ্রয় দিয়েছে এটাই তো অনেক। কান্নাজড়িত কন্ঠে নিজকাটা আর কে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সমাপ্তি জানায়, গত সপ্তাহে মডেল টেষ্ট পরীক্ষা দিয়েছি মাসির বাসায় থেকে।
স্কুলে যেতে পারি না, প্রাইভেট পড়তে পারি না। তাই পরীক্ষাও ভাল হয়নি। যেখানে ঘর থাকতেও ঘরে যেতে পারি না, সেখানে লেখাপড়া করে আর কী হবে। ব্বাা নেই তাই,কেউ আর আমাদের আদর করে না। শুধু চোখ রাঙানী দেখায়। বাসন্তী রানী জানায়, দুই মেয়েকে নিয়ে একরকম পথে পথে ঘুরছি। তাদের উপর নির্যাতনের মামলা করছি, মেম্বর- চেয়ারম্যানের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। কিন্তু স্বামীর ভিটায় তাদের আশ্রয় হচ্ছে না। এ কারনে বন্ধ হওয়ার পথে সন্তানদের লেখাপড়া। কেউ কী নেই এই অসহায়দের পাশে দাড়ানোর।
নীলগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান এ্যাড.নাসির মাহমুদ জানান, দুই মেয়ে নিয়ে বাসন্তী খুবই অসহায়। দু পক্ষ নিয়ে আমরা কয়েকবার বসার চেস্টা করেছি, কিন্তু কোন সমাধানে আসতে পারি নি। তবে তারা যদি পরিষদে সহায়তা চায় তাহলে আবার সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে। কলাপাড়া থানার এস আই ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হোসেন জানান, বাসন্তী রানীর দায়েরকৃত মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করা হবে।