স্বপন কুমার ঢালী, বেতাগী॥ বরগুনার বেতাগী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সূর্যভানু (৬০) গত শুক্রবার (২৯ আগস্ট) রাত সারে ১১ টায় নিজ বাড়িতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)।
তিনি হৃদরোগসহ শারীরিক বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে একছেলে ও একমেয়ে রেখে গেছেন। সূর্যভানু তার স্বামী মারা যাওয়ার পর দীর্ঘদিন যাবত বেতাগী বাসস্ট্যান্ডে পানি টেনে জীবিকা নির্বাহ করতো।
তার অবর্ননীয় দু:খকষ্ট নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা বিভিন্ন অনলাইন, স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করেছেন। শনিবার আসরের পর জানাযা নামাজ শেষে তার মরদেহ পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
কে এই সূর্যভানু ! ‘মোরা স্যার কাম না করলে খামু কী? কেউ তো মোগো লইগা খাওন বাড়ি লইয়া আয় না। বেয়ান (সকাল) হইতে রাইত পোরযন্ত হগোল দোহানে পানি দিয়া যে টাহা পাই হেইয়া দিয়া চাউল কিনি আর হেইতেই মোর সংসার চলে’ একথাগুলো অতিকষ্টে সূর্যভানু বেগম বলেছিল এ প্রতিবেদকের সাথে।
থাকেন বরগুনার বেতাগী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডে। বয়স ষাট। কিন্তু বিভিন্ন অসুখ বিসুখে তাঁর বয়স আরো বাড়িয়ে দিয়েছে এরুপ মনে হয়।
তাঁর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় জানা গেছে, আগে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন সূর্যভানু।
এখন পানি টেনে সংসার চালান। প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। কখনও এরচেয়ে বেশি সময় ধরে গভীর রাত পর্যন্ত বেতাগী বাসস্ট্যান্ডের বিভিন্ন দোকানে কলসিভর্তি পানি টানেন।
দোকানদারের চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করতে হয়। কোনো দোকানে টিউবওয়েলের পানি আবার কোথাও খালের পানি দেন। কাজের জন্য সময়মতো খেতেও পারেন না।
সূর্যভানু কখনও সকালের খাবার দুপুরে, আবার দুপুরের খাবার রাতে খেতে হয়। একযুগ আগে সূর্যভানুর স্বামী আব্দুস ছোমেদ মারা যান।
এরপর থেকে টানাপড়েনের সংসারে ছেলে মো. শাহীন (২১) মাত্র চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত আর মেয়ে মুন্নি (১৯) পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছেন।
গত ৪ বছর পূর্বে মেয়ে মুন্নিকে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ের বিয়ের দুবছর পর তার স্বামী মারা যায় এবং মেয়ের এক ছেলে সন্তান নিয়ে তার মায়ের ঘরে আশ্রয় নিয়েছে।
সূর্যভানু’র ছেলে শাহিন মায়ের কাছ থেকে ঢাকা পাড়ি জমান এবং তার কোন খোঁজ খবর নিচ্ছেন না। কেমন আছেন এমন প্রশ্ন করলে ফ্যাল ফ্যাল করে কেঁদে ফেলেন। পানি টেনে কলসপ্রতি পাঁচ টাকা করে আয় করেন তিনি।
প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আয় হয় তাঁর। তবে সূর্যভানু বলেন, ‘ বিভিন্ন অসুখ বিসুখে মুই এ্যাহন আর আগের মতো কাম করতে পারি না।
বেতাগী বাসস্ট্যান্ডে সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রচন্ড রোদের তাপে শরীর ঘেমে পানি পড়ছিল। সর্ম্পূন শরীর ঘামে ভিজে গেছে এবং কিছুক্ষনের মধ্যে আবার শুকিয়ে যায়।
আবার কখনও বৃষ্টিতে ভিজে কলসিভর্তি পানি বোঝাই করে সিটবিহীন প্রায় অকোজো ভ্যানগাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছেন একাই।
কিছুদূর যেতেই সামনের এক চায়ের দোকানে থামেলেন তিনি। পরে কলসিভর্তি পানি নিয়ে দোকানের ড্রামে ঢাললেন। এভাবেই দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর যাবত পানি টেনেই সংসার চালান।