• ৩১শে আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ১৬ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

নির্বাচনের পর থেকেই দেখা নেই প্রার্থীদের

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ৩১, ২০১৯, ১৪:৪৩ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র ২/১ জন প্রার্থী এলাকা ছেড়েছে নির্বাচনের আগেই। বাকিরা ভোটের ২/১ দিন পর। এরপর থেকেই এলাকার সাথে তেমন যোগাযোগ নেই গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দক্ষিনের ২১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের। নেতা-কর্মীদের খোজ খবরও বলতে গেলে নিচ্ছেনা কেউ। এদিকে এখনো জেলে আছে ৪ থেকে ৫ শ’ নেতা-কর্মী। এদের জামিন কিংবা তারিখে তারিখে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও মিলছেনা কোন সহায়তা। সব মিলিয়ে দারুন বিপাকে বরিশালের ৬ জেলা আর ৪৪ উপজেলার তৃনমূলের বিএনপি-নেতা কর্মীরা। রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ নেয়া তো দুরের কথা, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই যেন মুশকিল হয়ে পড়েছে তাদের জন্যে। পুরো বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও তার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর মতো ভরসার জায়গাটিও পাচ্ছেনা কেউ। শুরু থেকেই বিএনপি’র দলীয় মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ ছিল দক্ষিনের বেশ কয়েকটি জায়গায়। বছরের পর বছর নির্বাচনী এলাকায় না আসাসহ দলীয় কর্মকান্ডে অনুপস্থিত নেতাদের মনোনয়ন দেয়া নিয়ে ক্ষোভ ছিল দক্ষিনের অন্তত ৮ থেকে ৯টি নির্বাচনী এলাকায়। নির্বাচনের পর এইসব মনোনয়ন প্রাপ্তদের অনুপস্থিতিই যেন এখন সবচেয়ে বেশী চোখে পড়ছে। বরিশাল-১ নির্বাচনী এলাকায় দলীয় মনোনয়ন পাওয়া বিএনপি’র একসময়কার সংস্কারপন্থী নেতা জহিরুদ্দিন স্বপনের মনোনয়নের বিরোধিতা করেছিল সেখানকার বিএনপি নেতা-কর্মীরা। নির্বাচনের ২দিন পর ঢাকায় চলে যাওয়া স্বপন আজ পর্যন্ত আর আসেননি এলাকায়। এলাকার নেতা-কর্মীদের সাথেও নেই তেমন যোগাযোগও। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে গৌরনদী উপজেলা বিএনপি’র এক নেতা বলেন, ‘বরিশাল-১ আসনের দুই উপজেলার শতাধিক নেতা-কর্মী এখনো জেলে। হাইকোর্টে তাদের জামিনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এসব ব্যাপারে প্রার্থী স্বপনের কোন সহযোগীতা পাচ্ছিনা আমরা।’ বিষয়টি সর্ম্পকে জানতে চাইলে স্বপন বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের হামলা মামলা আর নিরাপত্তার অভাবে এলাকায় যেতে পারছিনা। তবে নেতা-কর্মীদের সাথে যোগাযোগ নেই এটা সত্য নয়।’ বরিশাল জেলার ৬ নির্বাচনী এলাকার মধ্যে কেবলমাত্র বরিশাল-৫ (সদর) এবং বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ)’র দুই প্রার্থী যথাক্রমে মজিবর রহমান সরোয়ার ও আবুল হোসেন ব্যতিত বাকি ৪ জনের বিরুদ্ধেই রয়েছে একই অভিযোগ। নির্বাচনের ২ দিন আগে থেকেই লাপাত্তা বরিশাল-২ আসনের প্রার্থী সরফুদ্দিন সান্টু। বাকিরা গিয়েছেন ভোটের ২/১ দিন পর। বরিশাল-৩ আসনের এ্যাড. জয়নুল আবেদিনের কাছ থেকে হাইকোর্টে জামিনের ক্ষেত্রে নেতা-কর্মীরা আইনী সহায়তা পেলেও অন্যদের যেন খোঁজই মিলছেনা। গত সপ্তাহের শেষের দিকে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ঝালকাঠী জেলা বিএনপি’র সাধারন সম্পাদক মনিরুল ইসলাম নুপুর। তিনি বলেন, ‘ঝালকাঠী-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া শাহজাহান ওমর ভোটের ২দিন পর চলে যান ঢাকায়। মামলায় জামিন প্রশ্নে ঢাকায় বসে তিনি কিছু সহযোগিতা দিলেও এক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যতিক্রম ঝালকাঠী-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া জিবা আমিন খান। ভোটের দিন ৩০ ডিসেম্বর এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে যাওয়া জিবা নেতা-কর্মীদের সাথে কোন যোগাযোগই করছে না। অথচ এই জেলার প্রায় ১২৩ জন নেতা-কর্মী এখনো জেলে।’ পিরোজপুর জেলা বিএনপি’র সাধারন সম্পাদক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করিনি বলে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জেলার ৩টি নির্বাচনী এলাকায় যেখানে যাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে মেনে নিয়েছি। এখানে পিরোজপুর-১ আসনে জামায়ত নেতা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র শামিম সাঈদী এবং পিরোজপুর-২এ’ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানকে ধানের শীষ দেয় ঐক্যফ্রন্ট। এলাকার বিএনপি নেতা-কর্মীদের সাথে এই দু’জনার কোনরকম কোন যোগাযোগ কখনোই ছিলনা। প্রচার প্রচারনার মাঠেও দেখা যায়নি তাদের। নির্বাচনের পরপরই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া এই দুই নেতা এখন কে কোথায় আছে জানেনা নেতাকর্মীরা। পিরোজপুর-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া রুহুল আমিন দুলাল ছিলেন জেলে। গেল সপ্তাহের শেষ দিকে জেল থেকে জামিনে বেড়িয়েছেন তিনি। পিরোজপুরের প্রায় ৮০/৯০ জন দলীয় নেতা-কর্মী এখনো কারাগারে। তাদের মামলার খরচ চালাতে হিমসিম খাচ্ছে। অথচ যারা দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নাম কামালেন তারা এখন উধাও।’ পটুয়াখালী-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া বিএনপি’র একসময়কার সংস্কারপন্থী নেতা সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী এলাকা ছাড়েন নির্বাচনের ১ দিন পর। এরপর আর যাননি এলাকায়। জেলা বিএনপি’র সাবেক সাধারন সম্পাদক ¯েœহাংশু সরকার কুট্টি বলেন, ‘বিগত ১০/১১ বছরে সর্বোচ্চ ৪/৫ বার এলাকায় এসেছেন চৌধুরী। তিনি আরো বলেন,দলীয় কোন কর্মকান্ডে অংশতো নেয়নি পাশাপাশি ১টা মামলা কিংবা ১দিনের জন্যও জেলে যাননি এই নেতা। জেলা বিএনপি’র সভাপতি হওয়া স্বত্বেও যে নেতা বছরে একবার এলাকায় আসেনা সে নির্বাচনের পর এলাকা ছেড়ে চলে গিয়ে নেতা-কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখবে না এটাই তো স্বাভাবিক। অথচ এখনো আমাদের বহু নেতা-কর্মী রয়েছে জেলে। মামলা পরিচালনাসহ কোন ক্ষেত্রে তারা কোন সহযোগিতা পাচ্ছেনা।’ পটুয়াখালী-১’র মতো জেলার অপর ৩ নির্বাচনী এলাকায়ও একই পরিস্থিতি। আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে এসে মুহুর্তেই ধানের শীষ পাওয়া সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনি এলাকা ছাড়েন ২ জানুয়ারী। পটুয়াখালী-২’এ মনোনয়ন পাওয়া সালমা আলম লিলি ঢাকায় যান নির্বাচনের পরপরই। নির্বাচনের ২/৩ দিন পর যান পটুয়াখালী-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী এবিএম মোশাররফ। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত আর এলাকায় আসেনি এদের কেউ। তৃনমূলের নেতা-কর্মীদের সাথেও নেই তেমন যোগাযোগ। বরগুনা-১ আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন পাওয়া মতিউর রহমান তালুকদারের সাথে মোটাসুটি যোগাযোগ আছে এলাকার নেতা-কর্মীদের। তবে একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বরগুনা-২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করা বিএনপি’র কেন্দ্রীয় আইনজীবি নেতা এ্যাড. খন্দকার মাহবুব। নির্বাচনের ১ দিন পর এলাকা ছেড়ে ঢাকায় যাওয়া এই নেতার সাথে বলতে গেলে যোগাযোগই করতে পারছেনা নির্বাচনী এলাকার অধিকাংশ বিএনপি নেতা-কর্মী। বিপদে আছে ভোলা জেলার ৪টি নির্বাচনী এলাকার নেতা-কর্মীরাও। ৩০ ডিসেম্বর রাতেই নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে যান ভোলা-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম। এরপর থেকে আর তিনি আসেননি এলাকায়। ভোলা-৩ আসনের প্রার্থী মেজর (অবঃ) হাফিজ এবং ভোলা-৪ আসনের নাজিমউদ্দিন আলম ঢাকায় যান ৩১ ডিসেম্বর। এরপর থেকে তারাও আর কোনরকম যোগাযোগ রাখছেন না এলাকার সাথে। তজুমদ্দিন উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের সংস্কারপন্থী হাফিজ বিএনপি’র মূলধারার ধাওয়া খেয়ে প্রায় ৮ বছর আগে এলাকা ছাড়েন। এরপর আর এলাকায় আসেননি। কেন্দ্র তাকে মনোনয়ন দেয়ায় ক্ষোভ ছিল নেতা-কর্মীদের মধ্যে। যে নেতা তার অতীত কর্মকান্ডের জন্যে এলাকায়ই আসতে পারতো না সে কি করে কর্মীদের দুঃখ বুঝবে?’ এমপি প্রার্থীদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়াই কেবল নয়, এবার দক্ষিনের প্রায় কোথাও বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী পর্যন্ত পালিত হয়নি। পুরো বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব সাবেক এমপি এ্যাড. মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘দেশে কি কোন আইনের শাসন আছে ? বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা ঘর থেকে বেরুতে পারেনা। আচমকা গণবিক্ষোভের আশংকায় সাধারন মানুষকেও জিম্মি করে রেখেছে সরকার। আমাদের এমপি প্রার্থীদের গনহারে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এই অবস্থায় নিরাপদে থাকার চেষ্টা করা নিশ্চই অন্যায় নয়। তবে এর মানে এই নয় যে আমরা দুর্বল। এটা ঘুরে দাড়ানোর কৌশল মাত্র। আশাকরি খুব শিঘ্রই বিপুল উদ্যমে আন্দোলনের মাঠে নামবে বিএনপি।’