• ২৮শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৪ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৪ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

শিরোনাম
ভোলায় ইয়াবা ও গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক মঠবাড়িয়ায় চঞ্চল্যকর সোবাহান পেয়াদা হত্যা মামলার ২ পালাতক আসামী গ্রেফতার রাজাপুরে মাঠজুড়ে হলুদের সমারোহ, কৃষকের মুখে হাসি বানারীপাড়ায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ৩জন বহিস্কার ভোলায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ বেদে নারী আটক বরিশাল কারাগারে বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করেন নবাগত জেলা প্রশাসক কলাপাড়ায় বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী দিদার উদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার গলাচিপায় রামনাবাদ নদীর উপরে প্রস্তাবিত ব্রিজের জায়গা পরিদর্শনে এমপি শাহজাদা আমাদেরকে কথায় নয় কাজে বড় হতে হবে: ডিসি ট্রাফিক জাকির হোসেন আমাদের উদ্দেশ্য মানবাধিকারকে সমুন্নত রেখে আইন শৃংখলা ঠিক রাখতে হবে: ডিসি খাইরুল আলম

স্মৃৃৃতিতে অম্লান

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত ডিসেম্বর ৩১, ২০২০, ২১:১৯ অপরাহ্ণ
স্মৃৃৃতিতে অম্লান

নূরে আলম সিদ্দিকী

স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক, মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত সংগঠক শাজাহান সিরাজ মৃত্যুবরণ করেছেন। ইহজগৎ থেকে পরলোকে গমন করলেও স্বাধীনতাযুদ্ধ সংগঠনের গৌরবে চিরঞ্জীব ও কালজয়ী মহান নেতা হিসেবে ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। রাজনীতিতে মতের ভিন্নতা থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি আমার সহোদরপ্রতিম ছিলেন।

 

সত্তরের নির্বাচন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে শাজাহান সিরাজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। চলনে-বলনে, আচরণে তিনি ছিলেন সমাজতান্ত্রিক মানসিকতার অনুসারী। তখন সময়টাই ছিল সমাজতান্ত্রিক প্রবহমান মননশীলতার। শাজাহান সিরাজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সমাজতান্ত্রিক মননশীলতায় কেবল উজ্জীবিতই ছিলেন না, হদয়ের নিভৃত কন্দরে নিজেকে কমিউনিস্ট ভাবতে একটা শিহরণ বোধ করতেন। অন্যদিকে আমি গণতান্ত্রিক মানসিকতার তো বটেই, সমাজতন্ত্রের কঠোর বিরোধী ছিলাম।

 

তখন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে দুটি সুস্পষ্ট ধারা প্রবহমান ছিল। বক্তৃতা-বিবৃতি, মিছিলের স্লোগান সবকিছুর মধ্যেই এই দুটি ধারার বহিঃপ্রকাশও ছিল উদগ্র। স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব—এই দুটি প্রশ্নে একটা সৃৃষ্ট যোগসূত্র স্বাধীনতার প্রবহমান চেতনাকে রাখতে পেরেছিল। স্বাধীনতা আসবে কোন পথে, এ নিয়ে মতবিরোধের কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না। শাজাহান সিরাজের গুরু সিরাজুল আলম খান (যদিও তিনি নেহেলিস্ট ছিলেন), তিনি স্থির লক্ষ্যে কখনই তার চেতনাকে প্রতিস্থাপিত করতে পারেননি। তবুও তিনি সত্তরের নির্বাচনের বিপক্ষে ছিলেন।

সিরাজুল আলম খানের সব অনুসারী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, বন্দুকের নলই সব ক্ষমতার উৎস। নির্বাচন এমনকি সত্তরের নির্বাচনও একটি প্রহসনমাত্র। নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া যায়, স্বাধীনতার স্বর্ণসৈকতে তরণি ভেড়ানো যায় না। যারা ভাবতেন, নির্বাচন-পূর্বে সশস্ত্র বিপ্লবই স্বাধীনতা অর্জনের মূল অস্ত্র, তাদের মধ্যে আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ নেতৃত্বের অগ্রভাগে ছিলেন।

তা সত্ত্বেও আমি নিষ্কলুষ চিত্তে, কৃতজ্ঞ সত্তায় সেইদিন থেকে আজ পর্যন্ত অকপটে বিশ্বাস করি, শাজাহান সিরাজ রাজনীতিতে যেখানেই অবস্থান করুন না কেন, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার প্রতি তার ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও ঐকান্তিকতা ছিল প্রগাঢ়।

 

সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে যে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা তখনকার ছাত্রলীগের নেতৃত্বে পরিলক্ষিত ও প্রতিভাত হতো, সেটি আমার প্রতি শাজাহান সিরাজের হদয়ের অকৃত্রিম বন্ধনের কারণে কখনই দেখা যায়নি।

নীতি-আদর্শ, বিপ্লব, নির্বাচন—এসব প্রশ্নে মতপার্থক্যে যোজন-যোজন দূরের হলেও শাজাহান সিরাজ তার হদয়ের নিভৃত কন্দরে আমাকে অগ্রজের আসনে অকৃত্রিমভাবে স্থান দিয়েছিলেন বলেই, বিভেদটা প্রকট হয়ে প্রকাশ তো করেইনি, বরং একটা আন্তরিকতার আবীরমাখা হয়ে প্রতিভাত হতো।

শাজাহান সিরাজ যখন আমাকে আলম ভাই বলে ডাক দিতেন, আমি বিমুগ্ধ তো হতামই, তার অনুসারী ছাত্রলীগের কর্মীদের মধ্যেও তা অনেকটা প্রভাব ফেলত। সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার কট্টর নেতাকর্মীরা অনেক সময় তার নমনীয়তার প্রশ্নে তাকে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি তার স্বভাবসুলভ স্নিগ্ধ হাসি হেসে বলতেন—‘প্রেসিডেন্ট, রাইট অর রং। সর্বোপরি প্রেসিডেন্ট আমার আলম ভাই। তোমরা চাইলেই আমি তার মুখোমুখি তর্ক করতে পারব না।

 

শাজাহান সিরাজের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আন্তরিকতার গভীরতা ছিল অসীম ও অতলান্ত। শাজাহান সিরাজরা জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করলেও বিপ্লবী ছিলেন। নির্বাচনে বিশ্বাস করতেন না। নির্বাচনকে স্বাধীনতার প্রশ্নে প্রহসন মনে করতেন। আর আমরা নির্বাচনকেই জনগণের ম্যান্ডেট ও স্বাধীনতা অর্জনের পাথেয় মনে করতাম। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই পল্টনের এক জনসভায় শাজাহান সিরাজ তার ভাষণে বললেন, ‘সামনে নির্বাচন, এ প্রহসনের নির্বাচন আমাদের বর্জন করতে হবে।

 

এ নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না। কারণ ফুটবল খেলায় গোলপোস্টের পেছনের জাল যদি সামনের দিকে টানিয়ে দেয়া হয়, তাহলে কোনোভাবেই গোল করা যায় না। এ নির্বাচনে স্বাধীনতা তো দূরে থাক, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার—কিছুই অর্জিত হবে না। বারপোস্টের পেছনের জালটি ইয়াহিয়া খান সামনের দিকে টানিয়ে দিয়েছেন ইলেকশন লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে। ইলেকশনের ধান্দা ছেড়ে দিয়ে সরাসরি সশস্ত্র বিপ্লবের সাধনায় ব্রতী হওয়া উচিত। ‘মুক্তির একটি পথ—বিপ্লব বিপ্লব’ এ স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র পল্টন ময়দান আগ্নেয়গিরির দাবানলের মতো জ্বলে উঠল। চারদিকে গগনবিদারী স্লোগান। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘ভোটের কথা বলে যারা ইয়াহিয়া খানের দালাল তারা’।

 

তখন ইত্তেফাকের সিরাজুদ্দীন হোসেন জীবিত ছিলেন। তিনি মঞ্চের পেছনে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন—নির্বাচন বর্জন করলে সব তো শেষ হয়ে গেল। তখন সিরাজুল আলম খানের সাজিয়ে রাখা কর্মীদের উচ্চকিত স্লোগানে পল্টন ময়দান দাবানলের মতো জ্বলছে।

আমি সিরাজ ভাইকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম—ইনশা আল্লাহ, এ সভায়ই নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তাব গৃহীত হবে। তিনি কতটুকু বিশ্বাস করলেন, বুঝতে পারলাম না। শাজাহান সিরাজের পর আ স ম আব্দুর রবের ভাষণ। তিনি তো আরো গরম। প্রচণ্ড উত্তেজনা ছড়ালেন। পল্টনের জনসভা এতটাই রুদ্ররোষে জ্বলছিল যে হুকুম দিলে গভর্নর হাউজ দখল করতে ছুটে চলে যায়।

 

আমি রব সাহেবের পর সভাপতির ভাষণ দিতে উঠলাম। চারদিকে কমরেড নূরে আলম সিদ্দিকী বলে বিপ্লবী সালাম দেয়া হচ্ছিল। এ যেন বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের উচ্ছ্বসিত উর্মিমালায় আমার অতি ছোট্ট একখানি তরণি। আমি উজ্জীবিত চেতনায় স্থির প্রত্যয়ে আমার বক্তব্য শুরু করলাম।

 

বক্তৃতার উপক্রমণিকার পর আমি সরাসরি শাজাহান সিরাজের বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়ে বললাম, শাজাহান সিরাজ যথার্থই বলেছেন, ইয়াহিয়া খান গোলপোস্টের পেছনের দিকের জাল সামনের দিকে টানিয়ে রেখেছেন। শাজাহান সিরাজের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে আমি বললাম, ইয়াহিয়া খানের মতো শাজাহান সিরাজও দড়ির শক্তি পরীক্ষা করে দেখেননি।

 

২৩ বছর ধরে বাঙালির রক্তে ভিজতে ভিজতে ওই জালের দড়ি পচে নরম হয়ে গেছে। আমাদের মুজিব ভাই ওই গোলে বলে শট মারলে জাল ছিঁড়ে গোল হয়ে যাবে, ইনশা আল্লাহ। গোটা পল্টন ময়দান গো-ও-ল বলে চিত্কার করে উঠল। সে এক বিস্ময়কর দৃশ্য।

 

অনেক কষ্টে তাদের থামিয়ে আমি আবার বক্তব্য শুরু করে বললাম—গোল হয়নি, গোল হয়নি—বসুন। বঙ্গবন্ধু ঠিকই গোলপোস্টে বল মেরেছেন কিন্তু তার আগেই শাজাহান সিরাজ অফসাইড হয়ে গেছেন।

নির্বাচনের আগে বিপ্লবের কথা বলা, নির্বাচনের আগে ম্যান্ডেটপ্রাপ্তির আগে অফসাইড হওয়ারই সমান। মুজিব ভাই গোল দেবেন, আমরা অফসাইড হব না।

স্বাধীনতার কথাই বলুন আর বিপ্লবের কথাই বলুন, নির্বাচনী ম্যান্ডেটপ্রাপ্তির আগে এগুলো বিচ্ছিন্নতাবাদের অপবাদে আখ্যায়িত হবে। বাংলার মানুষ ও বিশ্বজনমত বিভ্রান্ত হবে। আল্লাহর অশেষ রহমতে ওই সভাতেই সত্তরের নির্বাচনে অংশ নেয়ার সপক্ষে প্রস্তাব পাস হলো।

 

পল্টন ময়দান থেকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানসহ সারা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলায় আমরা জনসভা করেছি, ছাত্রলীগের সম্মেলন একত্রে করেছি। আমি দীর্ঘ সময় ধরে বক্তৃতা করতাম। এটা বদভ্যাস কিনা জানি না। বক্তৃতার প্রাক্কালে আমি বর্ণমালার অতলান্ত সাগরে অবগাহন করতাম।

 

সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শাজাহান সিরাজেরও সে সুযোগ ও অধিকার ছিল। আমার আগেই তিনি বক্তৃতা করতেন, কিন্তু কখনই অধিকারত্ব ফলাননি। আমার প্রতি এক গভীর ভালোবাসায় জনসভার সময় সংরক্ষিত রাখতেন, যেন আমি অবারিত হূদয়ে নিজের কথাগুলো তুলে ধরতে পারি।

 

ছাত্রলীগ বিভক্ত হওয়ার পর বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক ছাত্রলীগ এবং পরবর্তী সময়ে জাসদের কোনো জনসভা হতেই তিনি কখনই আমার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিষোদগার করতে দেননি।

 

প্রসঙ্গত আমি সিরাজুল আলম খান ও আ স ম আব্দুর রবকেও এক্ষেত্রে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে চাই। তারাও চাইতেন আমি প্রাণখুলে যেন আমার প্রাণের কথা বলতে পারি।

শব্দচয়নে আমি আলংকারিক শব্দই পছন্দ করতাম। প্রাসঙ্গিকতা এনে নানা কবিতার উদ্ধৃতি দিতাম, বক্তৃতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে উদ্ধৃতি দিতাম। এ প্রশ্নে শাজাহান সিরাজের অনুপ্রেরণা আমাকে উদ্বুদ্ধ, উজ্জীবিত ও উদ্বেলিত করত। শাজাহান সিরাজ আমার কাছে শুধু একটি নাম বা একটি পদই নয়, সে আমার অনুপ্রেরণা। যতদিন বেঁচে থাকব, প্রতিটি মুহূর্তে নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে হূদয়ের নিভৃত কন্দরে তার অবিস্মরণীয় স্মৃৃৃতি ও অম্লান সম্মানবোধ আমার হূদয়ের মণিকোঠায় জাজ্জ্বল্যমান থাকবে।

 

আমরা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছিলাম না। ব্যক্তিগত সম্পর্কে আমরা ছিলাম পরস্পরের অগ্রজ ও অনুজ। আমাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্য, মমত্ববোধ ও ঐকান্তিকতার যে পবিত্রতা প্রকাশিত হয়েছে, আজকের ছাত্রলীগের নেতৃত্বের ওপর তা প্রতিফলিত হবে, এ প্রার্থনা করি।

 

নূরে আলম সিদ্দিকী: রাজনীতিবিদ