• ২৭শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২রা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

স্বস্তির ঈদে চাঙ্গা উপকূলীয় গ্রামীণ অর্থনীতি

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত মে ১০, ২০২২, ১৫:১৬ অপরাহ্ণ
স্বস্তির ঈদে চাঙ্গা উপকূলীয় গ্রামীণ অর্থনীতি

জাকির হোসেন ॥ দীর্ঘ দু’বছর মহামারি করোনার ভয়াবহ ছোবলের পর এবছর স্বস্তির ঈদ উদযাপন করেছে গ্রামের মানুষ। প্রতি বছর ঈদ যাত্রায় যে ভাবে মানুষ হেনস্থার স্বীকার হয় এবছর বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া সেরকম কোন ঘটনা ঘটেনি।

এটা ছিল মানুষের প্রত্যাশার বাইরে। সময় এবং শান্তিপূর্ন ভাবে সবাই তাদের ঈদ যাত্রায় নিরাপদে ফিরতে পেরে অনেক খুশি তারা। স্বস্তির ঈদ পালনে যে ভাবে মানুষ মেতে উঠেছে সে সঙ্গে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে উপকূলীয় গ্রামীন অর্থনীতি। দু’বছরের লোকসানের ধকল কাটিয়ে অনেক ব্যবসায়ী এবছর তাদের মেরুদন্ড সোজা করে দাড়িয়েছে। এটা অর্থনীতির জন্য এটা একটি বিশাল সুখবর।

মুসলমানদের জীবনে ঈদের তাৎপর্য অনেক। ঈদ অর্থ খুশি এবং ফিতর অর্থ এসেছে ফিতরা থেকে। সুতরং ঈদ-উল-ফিতরের অর্থ দাড়ায় দান করার মাধ্যমে পবিত্র ঈদের উৎসবকে আনন্দে উদ্ভাসিত করে তোলা। ঈদ-উল-ফিতরকে ফিতরা বিতরণের উৎসব হিসাবেও বোঝানো হয়, ধনী থেকে দরিদ্রদের জন্য এক ধরনের দাতব্য, তাদের ঈদ উদযাপনে সহায়তা করে। জাকাত ফিতরার মাধ্যমে ধনী ও গরিবের মধ্যকার ভেদাভেদ দূরীভুত হয়।

ঈদের সামাজিক অর্থ ‘উসব’ আর আবিধানিক অর্থ পুন:রাগমন বা বারবার ফিরে আসা। তাই প্রতি বছরই মুসলমানদের জীবনে ঈদ ফিরে আসে।

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ উদযাপিত হয়। এটি হল মুসলমানদের ধর্মীয় প্রধান দ’ুটি উৎসবের একটি। ঈদুল ফিতর ‘রোজা ভাঙার উৎসব’ নামেও পরিচিত।

ইতিহাসবিদদের মতে মুসলিম ঐতিহ্য অনুযায়ী ঈদুল ফিতর ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) দ্বারাই প্রবর্তিত হয়েছিল হিজরী ২য় সালে (৬২৪ খ্রীষ্টাব্দ)।

অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগে। বদরের যুদ্ধে চূড়ান্ত মীমাংসাকারী বিজয় সে বছরেই অর্জিত হয়েছিল। হয়তো এই বিজয়ের স্মৃতিকে আরো আনন্দময় করে তোলার জন্য হযরত মুহাম্মদ (সা:) ওই বছর রমজানের মাস শেষে ঈদ উৎসব পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

তখন থেকেই শুরু হয়ে আসছে ঈদ উৎসব পালন। ঈদ উৎসব পালনের খবর সংগ্রহ করার জন্য এবছর সাগর তীরবর্তী সকিনা থেকে ফকির হাট, আমতলী থেকে রামনাবাদ নদীর তীরবর্তী উপকূল ঘুরে দেখা গেছে, গোটা এলাকা জুড়ে ঈদের একটা আবহ বিরাজ করছে।

গ্রামের বাঁকে বাঁকে, সড়কের বিভিন্ন স্থানে, জেলেপাড়া, কিংবা ওয়াপদার উপর ছোট টংঘরে আলোকঝলমলে দোকান ঘর সাজিয়ে ঈদের বিভিন্ন পন্যের পশরা সাজিয়ে দোকানিরা অপেক্ষা করছেন ক্রেতার জন্য। এ যেন এক অভাবনীয় দৃশ্য।

দুই তিন বছর আগেও এরকম দৃশ্য চোখে পরেনি। গ্রামীণ জনপদের মোড়ে মোড়ে রয়েছে মোবাইল ফোন রিচার্য করার জন্য ফ্লেক্সি আর টাকা আদান-প্রদানের জন্য বিকাশের দোকান। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে বসে কর্মজীবি সন্তান কিংবা পরিবারের কর্তা ব্যক্তি তাদের বাবা, মা ও স্বজনদের জন্য ঈদ খরচের টাকা পাঠাচ্ছেন।

মুহুর্তের মধ্যেই সে টাকা তুলে তারা কিনে নিচ্ছেন দুধ চিনি সেমাই আর নতুন শাড়ী ও জামা কাপড়। ভালোমন্দ খবারের জন্যও ব্যয় করছেন টাকা।

ঈদের সামাজিক আনন্দের আবহাওয়ায় রঙ্গিন হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতির চাকাও যেন ঘুরে দাড়িয়েছে এক নতুন রুপে। শহরের অলিগলি থেকে উপকূলীয় গ্রামীণ জনপদের দোকানে দোকানে বেচা কেনার ঢেউ যেন চোখে পরার মত।

ফকির হাটের করিম বয়াতি অত্যন্ত আনন্দের সাথে বলেন, দুই বছর পর মোরা এবছর ঈদের আনন্দ ভালো কইর‌্যা উপভোগ করছি। পোলায় ঢাহা চাকরি করে হে মোগো নতুন কাপড় চোপড় আর জামা কিন্যা বাড়ি লইয়াইছে। ঈদের দিন খাওয়া লওয়াও ভালো অইছে।

নিন্দ্রা গ্রামের মুরগী ব্যবসায়ীয় আসমান আলী বলেন, মাশাল্লা এবছর ঈদে বেচা বিক্রি অনেক ভালো ছিল। গত দুই বছরের লোকশান উডাইয়া ফালাইছি। এহন মোরা ঠিকমত চলতে পারমু।

লালুয়া গ্রামের কাপড় ব্যবসায়ী সোহরাব হোসেন বলেন, এইবার প্রায় ৬ লাখ টাহার কাপড় বেচছি। ব্যবসাও ভালো অইছে। গ্রামের মানুষের হাতে এবছর ম্যালা টাহা। করোনা না থাহায় হেগো এহন ব্যামালা আয় রোজগার।

মাঠে ঘাটে কাজ করা লোকজনও এবছর ঈদ উৎসবে মেতে উঠেছে। কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য পেয়ে বেজায় খুশি। তরমুজ, মুগডাল এবং ধানের বাজার ছিল চড়া। চাষীরা তাদের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে স্বস্তির ঈদটা যেন এবছর ভালো ভাবেই উদযাপন করতে পেরেছে। হলদিয়া গ্রামের মনির হাওলাদার বলেন, তরমুজ ব্যাইচ্ছা অনেক টাকা লাভ হরছি। লাভের টাহা দিয়া সংসারে ঈদে খরচ করছি। কেওয়া বুনিয়া গ্রামের মুগডাল চাষী সেলিম মিয়া বলেন, মুগডাল লাগাইয়া ব্যামালা টাহা ব্যাচছি। হেই টাহা দিয়া এবারগো ঈদে গুরাগারা লইয়া ঈদে জামা কাপড় নিছি। ঈদের দিন সেমাই পোলাউ আর মুরহা রাইন্দা খাইছি।

আমতলী শহরে অটোচালক আইয়ূব আলী বলেন, এইবার রোজার মধ্যে হক্কলদিন ৮০০-১০০০ টাহা আয় হরছি। ঈদের দুই দিন (প্রতিদিন) ২০০০-২৫০০ হাজার টাহা আয় হরছি। পোলা মাইয়াগো নতুন জামা কাপড় কিন্ন্যা দিছি। হেরপর ঈদের দিন একটু ভালো মন্দ খাইছি।

উপকূলীয় আমতলীর কলাগাছিয়া থেকে কাঠালিয়া, চাউলা থেকে ফকির হাট আর লালুয়া থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ঈদের জমজমাট আবহাওয়া থাকায় লেনদেন হয়েছে শত শত কোটি টাকা। ঈদকে ঘিরে গ্রামীণ বিভিন্ন সেক্টরে টাকার লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়ায় চাঙ্গা হয়ে উঠেছে উকলূলীয় গ্রামীণ অর্থনীতি। এ চাঙ্গা অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে বাড়াতে হবে রাষ্ট্রীয় আয়ের গতিশীল চাকা। মজবুত ভিত্তি নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে অর্থনীতির এ প্রবাহমান ধারাকে। আরো একটি সুসংবাদ রয়েছে, ঈদের সময় প্রবাসীদের আয়ের বড় একটা অংশ দেশে স্বজনদের খরচের জন্য পাঠিয়ে থাকেন। এবছর এপ্রিল মাসে প্রায় দুই’শ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে। এটা অর্থ নীতির জন্য একটা বিশাল সু-সংবাদ।

বেসরকারী সংগঠন এনএসএসএর নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পান্নার মতে উপকূলীয় বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলায় এবছর ঈদ বাজারে অন্তত:পক্ষে ৫শ’ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

রাখাইন তরুণী মায়া রাখাইন বলেন, ‘ধার-দেনা আর ব্যাংক ঋণ নিয়ে গড়ে ওঠা পর্যটক নির্ভর রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী তাঁত পণ্যের বিশাল মার্কেটটি করোকালে হুমকির মুখে পড়েছিল। এবার পর্যটকদের আগমনে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’

কুয়াকাটা ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন আনুর মতে এবছর ঈদের দিন থেক পরবর্তী চার দিন কুয়াটায় অন্তত:পক্ষে ২ লক্ষ পর্যটকের সমাগম ঘটেছে।

কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এমএ মোতালেব মনে করেন এবছর ঈদে কুয়াকাটায় সকল সেক্টরে শত কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন মনে করেন এবছর ঈদে ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

সিপিডির অর্তনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন এবার করোনা অনেক কমে আসায় ঈদের অর্থনীতি অনেকটাই পুনরুদ্ধার হয়েছে।

এনবিআর প্রাক্তন সচিব ও চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মাজিদ মনে করেন ঈদ-উল-ফিতরের প্রভাব সারা উৎসবকে ঘিরে আর্থ-সামাজিক অঙ্গনকে ব্যপকভাবে প্রভাবিত করেছে। ঈদকে সামনে রেখে পোশাক, পাদুকা, প্রসাধনী, গহনা ও ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের বাজারে হাজার কোটি টাকার বাম্পার বিক্রি হয়েছে। – “বৈষম্য রোধ, সম্পদের সঠিক বণ্টন এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগের জানালা এই উৎসবের মাধ্যমে তুলে ধরা যেতে পারে”।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, এবার করোনার বিধিনিষেধ না থাকায় ঈদের অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তিনি আরো বলেন, ঈদকে ঘিরে সকল সেক্টরে টাকা লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়া গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাও চাঙ্গা হয়ে উঠছে সন্দেহ নেই এতে।

(লেখক সিনিয়র সাংবাদিক জাকির হোসেন, আমতলী)