• ৩রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৮ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৬ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

মজিবর রহমান নাহিদ’র বিশেষ কলাম “ধর্ষকদের শাস্তি হোক মৃত্যুদন্ড”

admin
প্রকাশিত জুলাই ৯, ২০১৯, ২২:৪৪ অপরাহ্ণ
মজিবর রহমান নাহিদ’র বিশেষ কলাম “ধর্ষকদের শাস্তি হোক মৃত্যুদন্ড”

মজিবর রহমান নাহিদ ॥ কিছু নরপশুদের জন্য “ধর্ষণ” বর্তমানে একটি ব্যধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নরপশুদের হাত থেকে রক্ষা পায়না কোন সম্পর্কই। রাজধানীর ওয়ারীর বনগ্রামে শিশু সামিয়া আফরিন সায়মাকে (৭) ধর্ষণ ও হত্যা করে হারুন অর রশিদ নামে এক লম্পট। গত শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ওয়ারীর বনগ্রামের একটি বহুতল ভবনের ৯ তলার খালি ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের মেঝে থেকে শিশু সায়মার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সন্ধ্যার পরে তার মাকে খেলতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় সে।

পিতা-মাতার পরে যেই যাদের স্থান, সেই শিক্ষকের হাত থেকেও রক্ষা পায়না ছাত্রীরা। শ্নীলতাহানির স্বীকার হয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন নুসরাত জাহান রাফি।

গত ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে অধ্যক্ষ তার অফিসের পিয়ন নূরুল আমিনের মাধ্যমে ছাত্রীকে ডেকে নেন। পরীক্ষার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার। পরে পরিবারের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হন অধ্যক্ষ। সেই মামলা তুলে না নেয়ায় অধ্যক্ষের লোকজন ওই ছাত্রীর গায়ে আগুন দিয়েছে। হায়রে মানুষ! নির্মম এই ঘটনা নিয়ে কিছু বলার ভাষা নেই।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকে গতকাল একটি ভিডিও দেখে খুব অবাক হই। ঐ অধ্যক্ষকে আটকের পরে মাদ্রাসার একদল শিক্ষার্থীরা তার মুক্তির দাবীতে মানববন্ধন করেছে। সেখানে এক ছাত্র নুর উদ্দিন যেভাবে বক্তব্য দিয়েছিলো তা দেখে আমি পুরো হতবাক। এরকম একটি অভিযোগে অভিযুক্ত অধ্যক্ষের পক্ষে কোন মন মানুসিকতা নিয়ে মুক্তির জন্য হুংকার দিয়েছিলো সে? ঐ ছাত্র আরও হুংকার দিয়ে বলেন, “কোন সাংবাদিক যদি আমাদের বিপক্ষে লেখালেখি করে তাহলে তাকে আমরা দেখে নেবো।” এরকম আরও অনেক বক্তব্য ন্যাক্কারজনক বক্তব্য দিয়েছিলো সে। মুক্তি আন্দোলন পরিষদের আহবায়ক হিসেবে এই নুর উদ্দিন নাকি শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত রয়েছে। যা বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পারি।

মনে আছে আপনাদের বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার ধামসর অক্সফোর্ড মিশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই ৪র্থ শ্রেণীর শিশু শিক্ষার্থীর কথা? প্রধান শিক্ষক তাকে শ্লীলতাহানি করেছিলো। শিশুটির পরিবার যাতে মুখ না খুলে সেজন্য তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি ধামকি দিতো প্রধান শিক্ষক ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। পরে বরিশাল শহর থেকে আমরা বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী গিয়ে ঐ শিক্ষার্থীর পরিবারের সাথে কথা বলি। পরে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে থানায় মামলা করেন। সেই দিনই লম্পট প্রধান শিক্ষক গ্রেফতার হয়।

বরিশালের কাশিপুর গণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী সীমা আক্তারকে (৮) ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়েছিলো, তাকে হত্যা করে ট্রাক শ্রমিক ৪০বছর বয়সের কালু। মনে আছে বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরাদি ইউনিয়নে ধর্ষণের শিকার হয়ে লজ্জায় নিজের শরীরে কোরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে আত্বহত্যা করে স্কুলছাত্রী ১৩ বছরের সোনিয়া। হ্যা নিশ্চই মনে আছে। এদের সবাইকে স্বাধীন এই বাংলাদেশে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে ঐ পাকিস্থানীদের বংসধরদের কাছ থেকে ঠিক যেভাবে একাত্তরে মা-বোনদের ইজ্জত নিয়েছিলো মেলেটারীরা। এদের পাকিস্তানী বংসধর বললেও হয়তো ভুল হবে এরচেয়েও জঘন্য মন-মানসিকতার মানুষ এরা।

প্রতিদিন পত্র-পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় ধর্ষণ আর ধর্ষণ। শুধু পত্র-পত্রিকাই না সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকেও এখন প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের খবর দেখা যায়। ছোট্ট ৬মাসের শিশুকে ধর্ষণ, চাচার হাতে ভাতিজী ধর্ষণ, মামার হাতে ভাগনী ধর্ষণ এমন নির্মম ঘটনা শুনতে হচ্ছে আমাদের প্রতিনিয়ত। ছোট্ট শিশুর যৌনাঙ্গ কেটে লম্পটের যৌন খায়েস মিটানোর মতো এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা শোনার পরে হয়তো কোন সুস্থ মস্তিকের মানুষই ঠিক থাকতে পারেনা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শুধু ২০১২ সালে কমপক্ষে ১ হাজার ৮টি ধষর্ণের ঘটনা ঘটে যার মধ্যে ৯৮ জনকে ধষর্ণের পর খুন করা হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১১ সালে ৮০০ এর বেশি ধর্ষণ, ১৬৫টি গণধর্ষণ এবং ১৬টি ধষর্ণের পর খুনের ঘটনা ঘটে। যেহেতু এসব পরিসংখ্যান পত্রিকা এবং পুলিশ রিপোর্টভিত্তিক এবং বড়সংখ্যক ধষর্ণের শিকার বা তাদের পরিবার মামলা করে না বা ঘটনাটি গোপন রাখে, তাই ধারণা করা যায় বাস্তবচিত্র আরও ভয়াবহ।

পুলিশ সদর দপ্তরের ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তুলনামূলক এক অপরাধ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনায় সারা দেশে মামলা দায়ের হয়েছিল ৩ হাজার ৬ শত ৫০টি। ২০১৪ সালে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছিল ৩ হাজার ৬শত ৩৫টি। ২০১৫ সালে ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছিল ৩ হাজার ৯শত ৩০টি, ২০১৬ সালে তা হয়েছিল ৩ হাজার ৭শত ২৮টি। আর ২০১৭ সালে সারা দেশে ধর্ষণ মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৯শত ৯৫টি। চার বছরে বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনায় মোট মামলা দায়ের করা হয়েছে ১৮ হাজার ৯শত ৯৮টি। অর্থাৎ এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৭ সালে গত চার বছরে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ও মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক জরিপ থেকে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৬৯ জন। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২২৪ জন এবং ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে ৫৮ জনকে। আর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৮০ জন নারীকে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে সারা দেশে ৯৪২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৬৯৭ জন, গণধর্ষণের শিকার ১৮২ জন, ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৬৩ জন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বরিশালের আলোচিত ধর্ষণের ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি হলো, গত বছরের ২৭তারিখে কাশিপুর স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্রীকে নগরীর কলেজ রোডে তিন বন্ধু মিলে ধর্ষণ করেন। পরে অভিযানে ঘটনার ‘মূলহোতা’ বিএম কলেজ এলাকার মৃত বাবুল মল্লিকের ছেলে রাব্বি মল্লিক এবং মানিক নামে আরো দু’জনকে আটক করে কোতয়ালী থানার পুলিশ সদস্যরা।

বাংলাদেশে দন্ডবিধির ধারা ৩৭৬ অনুযায়ী বার বছরের বেশি বয়সি মেয়েকে ধর্ষণ করলে অপরাধী দুই বছরের কারাদন্ড বা অর্থ দন্ড বা উভয়দন্ড হতে পারে। পরবর্তীতে ২০০০ সালে এবং সর্বশেষ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ সংশোধন করা হয়। এতে নারী বা শিশুকে ধর্ষণের সাজা অনধিক দশ বছর কিন্তু অনূন্য তিন বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত করার বিধান করা হয়েছে। আবার ধর্ষণের পরবর্তী কোনো কার্যকলাপে যদি নারী বা শিশুটির মুত্য ঘটে তবে সেক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড হবে। এখানে শিশুর বয়স অনধিক ১৬ বছর ধরা হয়েছে। সূত্র: বিডি’লস।

ধর্ষণ, ধর্ষণ আর ধর্ষণ। নারীর সম্মান অকাতরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে এক শ্রেণির নরপশুর কারণে। এরা দেশ, জাতি ও সমাজের শত্রু।যাবজ্জীবন কিংবা জরিমানার মতো লঘু দণ্ড নয়, আমি মনে করি ধর্ষণকারীর একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত মৃত্যুদণ্ড। যাকে আর কেউ ভুলেও আমাদের ছোট্ট শোনামনি কিংবা বোনদের দিকে ভুলেও কুদৃষ্টি দিতে না পারে। আসুন আমরা ধর্ষকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি। ধর্ষকমুক্ত নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ি।

  • লেখকঃ মজিবর রহমান নাহিদ, বরিশাল প্রতিনিধি: আনন্দ টেলিভিশন ও সভাপতি: বরিশাল তরুণ সাংবাদিক ফোরাম।