বরিশালে ট্রিপল মার্ডার ২৪ ঘণ্টায় রহস্য উদঘাটন

মিশু ও আছিয়া আটক

প্রকাশিত: ৭:২৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৮, ২০১৯

বরিশালে ট্রিপল মার্ডার ২৪ ঘণ্টায় রহস্য উদঘাটন

মো. সুজন মোল্লা,বানারীপাড়া ॥

বরিশালের বানারীপাড়ায় আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের রহস্য ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে উদঘাটিত করেছে র‌্যাব ও পুলিশ। ট্রিপল মার্ডারের ঘাতক রাজমিস্ত্রি জাকির হোসেন ও তার সহযোগী জুয়েল হাওলাদার হত্যার ঘটনার আদ্যপান্ত খুলে বলার পাশাপাশি আদালতেও ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানাগেছে।

 

উপজেলার সলিয়াবাকপুর গ্রামের কুয়েত প্রবাসী আ. রবের বাড়ির দুই নির্মাণ শ্রমিক জাকির হোসেন ও জুয়েল হাওলাদার শুক্রবার রাতে প্রবাসীর বৃদ্ধা মা,ভগ্নিপতি ও খালাতো ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করে নিজেদের আড়াল করতে চেয়েছিল।

 

কিন্তু র‌্যাব-পুলিশের কৌশলী পদক্ষেপে আটক জাকিরের মুখথেকে বেড়িয়ে আসে হত্যার কারণ এবং তার সহযোগী অপর নির্মাণ শ্রমিক জুয়েল হাওলাদারের নাম।

 

মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঘাতক জুয়েল হাওলাদারকেও শনিবার রাতে বরিশাল শহর’র কাউনিয়া থেকে আটক ও প্রবাসীর বাসা থেকে লুটে নেওয়া স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করে।

 

র‌্যাবের মিডিয়া শাখা এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান ঘাতকদ্বয় জ্বীন নিয়ে আসার নামে শুক্রবার রাতে নাটকীয়ভাবে ওই বাড়ির দরজা খোলা রেখে প্রবাসীর বাসায় প্রবেশ করে লোমহর্ষক হত্যাকান্ড সংঘটিত করে। প্রবাসীর বাড়িতে আরও সদস্যের বসবাস থাকলেও ওই রাতে বৃদ্ধ মা মরিয়ম বেগম (৭৫), বেড়াতে আসা ভগ্নিপতি শফিকুল আলম (৬৫) এবং খালাতো ভাই ইউসুফ (২২) কে শ্বাসরোধ করে হত্যার সময়ক্ষণ কেউ আঁচ করতে পারেনি ।

 

সকালে বৃদ্ধার কলেজ পড়ুয়া নাততি আছিয়া আক্তার জেগে উঠে দাদির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে এ ঘটনা নিয়ে হৈই চৈই পড়ে যায়। পরে ঘরের অন্য কক্ষে ভগ্নিপতি শফিকুল আলম এবং বাড়ির পুকুরে খালাতো ভাই ভ্যানচালক ইউসুফের হাত-পা বাঁধা লাশ পর্যায়ক্রমে পাওয়া যায়।

 

ঘাতক কে বা পরিচয় কী এমন প্রশ্নে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, পিবিআই ও সিআইডি উত্তর খুঁজতে শুরু করে। অবশ্য ঘটনা জানাজানির পরপরই শনিবার সকালে স্থানীয় থানা পুলিশ বাড়িতে অবস্থানরত নির্মাণ শ্রমিক জাকির হোসেনকে আটক করে।

 

 

প্রশাসনের জিজ্ঞাসাবাদে জাকির হোসেন হত্যাকান্ডে নিজের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করে জুয়েল নামে একজন সহযোগীর নাম প্রকাশ করে। পরে শনিবার বেলা ১২ টার মধ্যে র‌্যাবের একটি টিম গোটা হত্যাকান্ডের ক্লু উপলব্ধি করে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে জুয়েলের অবস্থান শনাক্তে মাঠে নামে। শনিবার রাতে বরিশাল শহরের পশ্চিম মতাশার মুহুরিকান্দা এলাকা থেকে জুয়েলকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

 

এই সময় জাকিরের বরিশাল নগরীর সাগরদীর ভাড়া বাসা থেকে ওই রাতে লুণ্ঠিত স্বর্ণালঙ্কার ও তিনটি মোবাইল সেটসহ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরি উদ্ধার করে। গ্রেপ্তার জুয়েল ও জাকিরকে মুখোমুখি করা হলে উভয়ে অভিন্ন তথ্য দিয়ে জানায় লোভের বশবর্তী হয়ে তিনজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পুর্বে তারা ওই জ্বীন নিয়ে আসার নাটক সাজিয়ে ছিল।

 

 

র‌্যাব সূত্র জানায়-জাকির দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী আব্দুর রবের বাড়িতে নতুন ভবন নির্মাণে শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি জ্বীনের ওঝাঁ বা বাদশা পরিচয় দিয়ে নিজের দক্ষতা প্রকাশ করে পরিবারের সাথে ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে।

 

যাতায়াতের সূত্র ধরে প্রবাসীর বাড়িতে বেশি মাত্রার স্বর্ণালঙ্কার থাকার ধারণায় সদ্য কাজে যোগদান করা অপর সহযোগী নির্মাণ শ্রমিক জুয়েলের সাথে চুরির পরিকল্পনা করে। কিন্তু ঘটনার রাতে জ্বীন নিয়ে আসার নামে বাড়ির দরজা খোলা রাখার পরামর্শ দেওয়া হলেও পিরোজপুরের স্বরুপকাঠি থেকে বেড়াতে আসা প্রবাসীর ভগ্নিপতি শফিকুল আলম ও খালাতো ভাই ইউসুফের উপস্থিতি অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

 

 

একপর্যায়ে উভয় ঘাতক মিলে একে একে তিনজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। তবে পুলিশের একটি সূত্র জানায়- যুবক ইউসুফ প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হত্যার পর বাড়ির পার্শ্ববর্তী পুকুরে হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয়া হয়। এই ঘটনা মরিয়ম ও শফিকুল আলম আঁচ করতে পারায় তাদেরকেও একই পরিণতির শিকার হতে হয়।

 

 

হত্যাকান্ডের পরে ভোরে গ্রামবাসীর অলক্ষ্যে জুয়েল লুণ্ঠিত মালামাল নিয়ে বরিশাল শহরে চলে যায়। কৌশলগত কারণ অর্থাৎ নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে রাতে ওই এলাকায়ই থেকে যায়। মূলত সে প্রচার করতে চেয়েছিল গোটা ঘটনাটি চুরি-ডাকাতির ঘটনা।

 

এদিকে ঘটনার একদিন পর রোববার সকালে প্রবাসী হাফেজ আ. রবের ছোট ভাই ঢাকায় এনআরবি ব্যাংকে কর্মরত সুলতান মাহামুদ বাদী হয়ে বানারীপাড়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

 

অপরদিকে ট্রিপল এ হত্যাকান্ড শুধু কি স্বর্নালঙ্কার ও টাকা পয়সা লুটের কারণে নাকি পরকীয়া প্রেমের কোন ঘটনা রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে কাজ করছে পুলিশ।

 

রোববার সকালে ঘটনার সময় অক্ষত থাকা প্রবাসীর স্ত্রী মিশরাত জাহান মিশু ও ভাতিজী কলেজ ছাত্রী আছিয়া আক্তার আফিয়াকে থানায় ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। বিকালে হত্যাকান্ডের শিকার ওই তিনজনের জানাজা ও দাফনের সময় মিশু ও আছিয়াকে পুলিশ প্রহরায় বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

 

পরে তাদেরকে আবারও থানায় নিয়ে আসা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত ছিলো।

Shares