স্টাফ রিপোর্টার ॥ দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে ভূমি অধিগ্রহণের সুযোগে কৃষি জমিতে ঘরবাড়ি তোলা, পুকুর কাটা ও গাছপালা লাগানোর হিড়িক পড়েছে। আর্থিকভাবে বেশি ক্ষতিপূরণ আশায় লোকজন নিজেরাই এসব করছে। আবার এজন্য এলাকায় একাধিক দালালচক্রও গজিয়ে উঠেছে।
তারাও লোকজনকে ঘরবাড়ি তোলায় উদ্বুদ্ধ করছে। অধিক আর্থিক ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ভাগাভাগির চুক্তিতে দালালরা গরিব লোকজনদের আগাম দাদনও দিচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও কেউ কেউ এ কাজে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও প্রশাসন ইতোমধ্যে এ অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে। বর্তমানে পায়রা সমুদ্রবন্দরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ দ্রুত বাস্তবায়নে কলাপাড়ার নয়টি মৌজায় ২১টি প্রকল্পের জন্য সাড়ে ৬ হাজার একর জমি অধিগ্রহণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশাসন জমির মালিকদের নোটিস দেয়ার কাজও শেষ করেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ১৯ নবেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর হিসেবে ‘পায়রা’র ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন এবং ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পায়রাবন্দর থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এর আগে ৩১ জুলাই চীন থেকে ৫৩ হাজার টন পাথর নিয়ে পায়রা সমুদ্রবন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের বহির্নোঙ্গরে আসে প্রথম জাহাজ এফবি ফরচুন বার্ড। বর্তমানে পায়রা সমুদ্রবন্দরে বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ইতোমধ্যে পায়রাবন্দরে সার্ভিস জেটি স্থাপন করা হয়েছে। পানি শোধনাগার, প্রশাসনিক ভবন, নিরাপত্তা ভবন, ওয়্যার হাউস নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দর সূত্রে জানা গেছে, বন্দরের চাড়িপাড়া বহির্নোঙ্গরে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী রাবনাবাদ নৌ চ্যানেলের পশ্চিম তীরে অবস্থিত পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য ২০১৩ সালের ৩ নবেম্বর জাতীয় সংসদে ‘পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ’ আইন পাস হয়।
এ আইনের আওতায় রাবনাবাদ নদী ও বঙ্গোপসাগর মোহনার মধ্যবর্তী টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়া এলাকায় পায়রা সমুদ্রবন্দরের অভ্যন্তরীণ নোঙ্গর স্থাপন করা হয়। নোঙ্গরের অবকাঠামো নির্মাণের কাজও কিছুদিনের মধ্যে শুরু হবে।
এদিকে পায়রা সমুদ্রবন্দরে প্রস্তাবিত অধিগ্রহণ ভূমির সীমানার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।
জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির সভার মাধ্যমে বিষয়টি সকলকে অবহিত করার উদ্যোগ নিতে জেলা প্রশাসক বরাবরে চিঠি দেয়া হয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষের যুগ্ম-পরিচালক (এস্টেট)-এর উপ-সচিব খন্দকার নুরুল হকের গত ১২ জুন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর নির্মাণে কলাপাড়া উপজেলার রাবনাবাদ এলাকার বিভিন্ন মৌজায় ৬ হাজার ৫২৬ দশমিক ২৭ একর জমি অধিগ্রহণের নিমিত্তে ২১টি এল.এ কেসের প্রস্তাবের বিপরীতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়টি বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দর বর্তমান সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পভুক্ত একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বন্দরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক এবং অপারেশনাল কার্যক্রম দ্রুত চালুর লক্ষ্যে নির্মাণ কাজ শুরু করার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, পায়রাবন্দর কর্তৃপক্ষের অধিগ্রহণকৃত এবং প্রস্তাবিত জমির সীমানায় অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। যা ‘পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ’ আইন, ২০১৩ অর্থাৎ ২০১৩ সালের ৫৩ নম্বর আইনের ২২ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অধিগ্রহণের জমিতে নতুন কোন স্থাপনা নির্মাণ হলে একদিকে সরকারী রাজস্বের অপচয় হবে, অন্যদিকে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ হবে। পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে জানা যায়, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া, নয়াকাটা, বানাতিপাড়া, চান্দুপাড়া, লেমুপাড়া, চরবালিয়াতলি, ধুলাসার, লোন্দা ও ইটবাড়িয়া এ নয়টি মৌজা থেকে ৬ হাজার ৫৬২ দশমিক ২৭ একর ভূমি পায়রাবন্দর কর্তৃপক্ষের অধিগ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।