• ২রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৬শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

গ্রেনেড হামলা মামলার ফাঁসির আসামি বিএনপি নেতা এখন নৌকার মাঝি!

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত নভেম্বর ২৫, ২০২১, ১৮:৫৮ অপরাহ্ণ
গ্রেনেড হামলা মামলার ফাঁসির আসামি বিএনপি নেতা এখন নৌকার মাঝি!

বিডি ক্রাইম ডেস্ক, বরিশাল: টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোনিন্দাসি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এক সময়ের কুখ্যাত ডাকাত সর্দার, ধর্ষণ ও একাধিক হত্যা মামলার আসামি দুলাল হোসেন চকদারকে।

তিনি (দুলাল হোসেন চকদার) ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম পিন্টুর অন্যতম সহযোগী।

এ নিয়ে ওই ইউনিয়নসহ পুরো উপজেলাতেই চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। এতে করে উপজেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এই ইউনিয়নে যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিয়ে একজন সুবিধাভোগীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মনোনীত প্রার্থী যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলেই খোলস পাল্টে তিনি যোগ দেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, দুলাল হোসেন চকদারতো মনোনয়ন পেলেন। এখন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারলে পুরো ইউনিয়নবাসী তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়বে। এখনই তার ভয়ে কেউ কথা বলতে সাহস পায় না। আর চেয়ারম্যান হলে তো তার সামনেই কেউ যেতে পারবে না।

দুলাল হোসেন চকদারের বাড়ি ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসি ইউনিয়নের খানুরবাড়ি গ্রামে। কুখ্যাত ডাকাত সর্দার হিসেবে যার পরিচিত ছিল পুরো টাঙ্গাইলসহ এর আশেপাশের জেলাজুড়ে। তিনি এখন ভূঞাপুরে যমুনার বালু দস্যু।

একাধিক হত্যাসহ অনেক মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে সুবিধাভোগী দুলাল হোসেন চকদার যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের নেতাকর্মীর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেন এবং পরবর্তীকালে তার বিরুদ্ধে করা মামলার বাদিকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা প্রত্যাহার করে নেন।

চতুর দুলাল তার বালু লুটের সাম্রাজ্য ধরে রাখতে সবসময় থাকেন ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে তিনি একসময় আওয়ামী লীগ ও একসময় বিএনপিতে যোগদান করেন। এক কথায় বলা যায় সুবিধাভোগী।

১৯৯৬ সাল থেকে দুলাল আওয়ামী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বেড়ে যায় তার যমুনা নদীতে ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রম। ওই সময় তার বিরুদ্ধে এক নারী ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।

আর ওই মামলা থেকে বাঁচতে তিনি ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছেড়ে বিএনপিতে যোগদান করেন। শুরু হয় ডাকাতির পাশাপাশি অবৈধভাবে বালুর ব্যবসা।

জোর করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে তিনি এখন কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। আর তার এই বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশলী আওয়ামী লীগ নেতাদের হাত করে ফেলেছেন অর্থের বিনিময়ে।

এ কারণে বিপুল অর্থের বিনিময়ে কুখ্যাত ডাকাত সর্দার বিএনপি নেতা দুলাল চকদারকে দেওয়া হয়েছে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ। এতে করে দুলাল চকদার আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তার নিয়ন্ত্রণেই চলছে পুরো ভূঞাপুর উপজেলার বালুর ঘাট।

একটি সূত্র জানায়, মৃত আকবর চকদারের ছেলে মো. দুলাল হোসেন চকদার একটি ধর্ষণ মামলা থেকে রেহাই পেতে ২০০৪ সালের ১৬ এপ্রিল তৎকালীন উপমন্ত্রী (বর্তমানে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি) আব্দুস সালাম পিন্টুর হাতে ফুলের তোড়া তুলে দিয়ে জাতীয়তাবদী দল বিএনপিতে যোগদান করেন।

একারণে তাকে ওই দিনই গোবিন্দাসী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আমিনুল ইসলাম আমিন ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইকরাম উদ্দিন তারা মৃধা স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে মো. দুলাল হোসেন চকদারকে আওয়ামী লীগের সদস্য পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিস্কার করা হয়। বিএনপিতে যোগদানের পর থেকেই সালাম পিন্টুর অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন।

পরবর্তীকালে সালাম পিন্টুর হস্তক্ষেপে দুলাল ধর্ষণ মামলা থেকে রেহাই পান। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি আবার বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

সখ্যতা গড়ে ওঠে উপজেলা আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে। এরপর থেকে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। শুরু করেন অবৈধভাবে যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন ও ব্যবসা। এ নিয়ে তার বিরোধীদের সঙ্গে শুরু হয় দ্বন্দ্ব।

এ কারণে বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ২০১২ সালের ২ সেপ্টেম্বর দুলাল বাহিনীর গুলিতে নিহত হন বালু ব্যবসায়ী নাসির। এরপর ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভূঞাপুর উপজেলার নেংরা বাজার বালুরঘাট দখল করতে যায় দুলাল ও তার বাহিনী।

সেসময় বালু ব্যবসায়ী জুরান মণ্ডল ও আওয়ামী লীগ নেতা মতিন সরকার (বর্তমানে নিকরাই ইউপি চেয়ারম্যান) দুলাল বাহিনীকে বাধা দেয়।

পরে দুলাল ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে গ্রেফতার না করে দুলাল হোসেন চকদারকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে।

এতে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে সড়ক অবরোধসহ বিক্ষোভ মিছিল করলে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৩০ ক্যান বিয়ারসহ দুলাল ও তার দুই সহযোগীতে আটক করে।

কিছুদিন যেতে না যেতেই দুলাল জামিনে বের হয়ে আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন। ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দুলাল বাহিনীর গুলিতে গুরুতর আহত হন বালু ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম।

এসব অভিযোগের বিষয়ে দুলাল হোসেন চকদারের সঙ্গে মোবাইলে চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।