• ২রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৬শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

উপকূল থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে হরিয়াল ! 

বিডিক্রাইম
প্রকাশিত নভেম্বর ৮, ২০২১, ১৭:৫৯ অপরাহ্ণ
উপকূল থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে হরিয়াল ! 
স্বপন কুমার ঢালী, বেতাগী  :  ‘লুটায়ে রয়েছে কোথা সীমান্তে শরৎ- উষার শ্বাস!/ ঘুঘু-হরিয়াল-ডাহুক-শালিখ-গাঙচিল-বুনোহাঁস’।  রূপসি বাংলার কবি জীবনানন্দ দাসের  লাইন দুটি পড়ে অনেক কাব্যপ্রেমিকের মনে কৌতুহল জাগে হরিয়াল পাখি নিয়ে। একসময় দেশের চিরহরিৎ বনাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে হরিয়াল দেখতে পাওয়া যেত। কেবল বনাঞ্চল নয় গ্রামীণ জনপদেও এদের বিচরণ ছিলো।
  হরিয়ালের ইংরেজি নাম ‘গ্রিন পিজন’ এবং বৈজ্ঞানিক নাম ট্রেরন। গ্রামাঞ্চলের বটগাছ, ডুমুর (বহই) গাছে এরা মূলত বসতো। দল বেঁধে উড়তো, বর্ষাকালে হরিয়াল বাসা বাঁধে ও ডিম পাড়ে। খঁড়কুটো, মরা ডালপালা ও গাছের পাতা দিয়ে এরা বাসা বাঁধে। এদের প্রধান খাদ্য ফল হলেও বাদাম ও বীজ খেতেও তারা পছন্দ করে।
এদের ডানা লম্বা, গোলাকার ও সুঁচালো। বলিষ্ঠ পা বেশ খাটো। পায়ের তলায় মাংসল গদি থাকে। যা বৃক্ষে চলাফেরার জন্য উপযোগী। স্ত্রী এবং পুরুষ হরিয়ালের চেহারায় বেশ তফাৎ রয়েছে।
এক সময় উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগী এলাকার অহরহ দেখা যেত ওই নান্দনিক হরিয়াল পাখি।
হরিয়ালের গলা, পাখা ও লেজের পালক ঝকঝকে সোনালি রঙের। এদের পা দুটোও সোনালি রঙের হয়ে থাকে। পায়ের তলায় মাংসল গদি থাকে যা বৃক্ষে চলাফেরা করার উপযোগী।
 হরিয়ালের গায়ের রঙ সাধারণত হলদে, জলপাই ও সবুজ হয়ে থাকে। ছোট হরিয়াল দৈর্ঘ্যে ২৫ থেকে ২৮ সেন্টিমিটার হয়। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চেহারা আলাদা ধরণের হয় । পুরুষ পাখির কপাল ধূসরাভ। মাথা সবুজাভ-হলুদ। ঘাড়ে হালকা ধূসরাভ পট্টি। পিঠ ও ডানা গাঢ় দারুচিনি রঙের। ডানার প্রান্ত পালক হলুদাভ-সবুজ। সঙ্গে কালো খাড়া মোটা টান। সবুজ বুকে ফ্যাকাশে কমলা প্যাঁচ। স্ত্রী পাখির কপালে ও ঘাড়ে ধূসরাভ পট্টি নেই। পিঠ-গাঢ় সবুজ। উভয়ের ঠোঁট সবুজাভ-ধূসর। চোখ হালকা নীলাভ। পা গোলাপি লাল।
সমগ্র বিশ্বে প্রায় ২৩ প্রজাতির হরিয়াল রয়েছে। বাংলাদেশেও বেশ কয়েক প্রজাতির হরিয়াল বিদ্যমান। বাংলাদেশ ছাড়াও উত্তর-পূর্ব ভারত, শ্রীলঙ্কা, পূর্ব ফিলিপাইন ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে হরিয়াল পাখি দেখতে পাওয়া যায়। এদের প্রিয় খাবার বট ফল এবং ডুমুর। একসময় পথের প্রান্তে বটগাছের উঁচু ডালে সাত সকালে দল বেধে এই পাখিগুলোকে রোদ পোহাতে দেখা গেলেও, এ দৃশ্য এখন বিরল। গ্রামের বড় বটগাছ ও ডুমুর  গাছেই তারা বাসা বাঁধতো। বৃক্ষ নিধনকারীরা ওই গাছ কেঁটে ইট ভাটায় পোড়ানোর কারণে মূলত হরিয়াল পাখি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ।
    শীতকাল মূলত হরিয়ালের প্রজনন সময়। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে একটি মেয়ে হরিয়াল নিজেদের তৈরি পত্র-পল্লবে ঘেরা বাসায় মাত্র দুটি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা হতে সাধারণত ১৬ থেকে ১৮ দিন সময় লেগে যায়।
এককালে সারা দেশ জুড়ে হরিয়াল দেখা গেলেও এখন কেবল পাহাড়ি ঘন বনাঞ্চলে হরিয়াল দেখতে পাওয়া যায়। নির্বিচারে পাখি শিকার এবং বনাঞ্চল উজাড় করে দেওয়া হরিয়াল এখন বিলুপ্তির পথে। বাংলা প্রবাদ- ‘আপনা মাংসে বৈরি হরিণী’ হরিয়ালের সাথে খাপে খাপ মিলে যায়। এখনই যদি এই পাখিটির জন্য একটি নিরাপদ অভয়ারণ্যের ব্যবস্থা না করা যায় তো অচিরেই বাংলাদেশ থেকে হরিয়াল সম্পূর্ণ রূপে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
      বেতাগী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও কালের কন্ঠ’র প্রধান উপদেষ্টা মনোরঞ্জন বড়াল  বলেন, হরিয়াল পাখি আগে সচরাচর দেখা গেলেও এখন আর তেমন একটা দেখা যায় না। মানব সম্পদের প্রয়োজনে বট, খেজুর ও ডুমুর  গাছ কেঁটে ফেলার কারণে ওই পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে গেছে। আবাসস্থল সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা গড়ে তুলতে না পারলে নান্দনিক প্রজাতির হরিয়াল পাখি সংরক্ষণ করা আর সম্ভব হবে না।
       বেতাগী  সরকারি কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের  প্রভাষক শক্তিপদ বিশ্বাস বলেন,’ বেঁচে থাকার জন্য যেকোনো পাখির প্রধান চাহিদা হচ্ছে খাদ্য ও বাসস্থান। যখন এ দু’টোরই সংকট দেখা দেয় তখনই তারা হয় অন্যত্র চলে যায় অথবা বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমান সভ্যতার দাপটে আমারা তো প্রকৃতি ধ্বংসে মেতেছি। এ কারণে হরিয়াল পাখিও বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে ।
উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ বলেন,’ গ্রাম বাংলার নান্দনিক হরিয়াল পাখিকে ছাত্র জীবনে গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন বট, ডুমুর  গাছে ঝুলে ঝুলে ফল খেতে দেখতাম। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রকৃতিগত কারণে হরিয়াল পাখি এখন বিলুপ্তির পথে।’