• ৩রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৮ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৬ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

ইসলাম ধর্মে সংঘাত নয় শান্তির পথ প্রদর্শন করে

admin
প্রকাশিত জুন ১৮, ২০১৯, ২২:৩৫ অপরাহ্ণ
ইসলাম ধর্মে সংঘাত নয় শান্তির পথ প্রদর্শন করে

মোঃ নূরুল হাছান :  ৪ঠা মার্চ ২০১৯, মুসল্লী ও স্থানীয় যুব সমাজের উদ্যোগে ইছাকাঠী, কাশিপুর, সৈয়দ হাতেম আলী জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে সংঘটিত হয়ে গেল তাফসিরুল কোরআন মাহ্ফিল। স্থানীয়দের মধ্যে বেশ উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল এই মাহ্ফিলকে কেন্দ্র করে।

আমিও তার একটি অংশ হয়ে গেলাম এবং সেখানে যাওয়ার দাওয়াতও পেলাম। আমাদের বাসা থেকে মসজিটির দূরত্ব আনুমানিক ২৫০  ৩০০ মিটার। আমার বাবা সমজিদটির শুরু থেকে আমৃত্যু এর উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিল। আমরা সব ভাই-বোনেরাও তাই এর সব কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত থেকে সবসময়েই
আনন্দ পাই।

যাহোক, ৪ তারিখ সারাদিন এলাকায় সবার মধ্যে বেশ উৎসাহ লক্ষ্য করলাম।
সারাদিন মাইকে গজল-হাম্দ পরিবেশিত হচ্ছিল এবং আমরা বাসা থেকেই সবকিছু
শুনতে পাচ্ছিলাম। বেশ ভাল লাগছিল। সন্ধ্যার পর সেখানে উপস্থিত হয়ে কিছু
প্রাণবন্ত আলোচনা উপভোগ করলাম। বহু বছর পর এমন একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত
হতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। এশার নামাজের বিরতিতে বাসায় এসে
কিছু খেয়েদেয়ে আবার যাবো বলে মনস্থির করলাম। রাত ১০টা নাগাদ আবার তৈরি
হয়ে বাসার বাগানে বসে চা খাচ্ছিলাম ও ওয়াজ শুনছিলাম। তখন প্রধান অতিথি
হযরত মাওলানা মুফ্তি শিফাত উল্লা সালেহি সাহেব, খতিব বাইতুস সালাহ্ জামে
মসজিদ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা বক্তব্য রাখছিলেন।

বেশ ভালো লাগছিল তার কথাগুলো। অনেক জ্ঞান রাখেন তিনি, অনেক উদাহরণ দিয়ে কথা বলছিলেন তিনি। মাহ্ফিল আঙ্গিনায় যাব যাব ভাবছি প্রধান অতিথি সাহেবের বক্তব্য শুনবো বলে। ইতিমধ্যে তিনি কবি শওকত ওসমান ও ব্লগারদের প্রসঙ্গে টেনে বললেন “এদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই” কথাগুলো শোনার পর মনটা খুব খারাপ হলো। আর যেতে মন চাইলো না মাহ্ফিল প্রাঙ্গণে। বার বার মনে হচ্ছিল হেদায়েত দেয়ার মালিকতো আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন, কাউকে ক্ষমা করা বা শাস্তি দেয়ার মালিকও
তিনিই।

এমনতো হতে পারে ঐ ব্লগারকে তিনি এমনভাবে হেদায়েত দিবেন যাতে তার
কলম ইসলামের পক্ষে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। সেক্ষেত্রে আমাদের ধর্মগুরু
বা আলেমরা যদি তাদেরকে বোঝানোর জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তাহলে
তাদের পরিবর্তন আসলেও আসতে পারে। এরকম নানান প্রশ্নের ও উত্তরের সৃষ্টি
হতে থাকলো আমার প্রবাস ফেরা নরম মনটার উপর। কি বলতে চাইলেন আমাদের প্রধান
অতিথি সাহেব? এতো সুন্দর বক্তব্যের মধ্যে তিনি কোন ধরণের ইঙ্গিত দিলেন?

মাহ্ফিলে উপস্থিত কোনো একজনও যদি তার কথায় উজ্জিবীত হয়ে ডাঃ জাফর ইকবাল
সাহেবের মতো কোনো একটি ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে তাহলে তার দায়ভার কে নিবে?
উল্লেখ্য যে ছেলেটি ডাঃ জাফর ইকবাল সাহেবকে অনুষ্ঠানের মধ্যে ধারালো
অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছিল, সে নিজের বক্তব্যে পরবর্তীতে বলেছে যে, সে জাফর
ইকবাল সাহেবের একটি বইও পড়েনি। সে শুধু শুনেছে যে, ডাঃ জাফর ইকবাল
ইসলামের বিপক্ষে লেখেন। ডাঃ জাফর সাহেবও সুস্থ হওয়ার পর বলেছেন, আমার বই
পড়ে থাকলে ছেলেটি কখনোই এমন কাজ করতো না।

আমি একজন প্রগতিশীল সচেতন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কোনো ব্লগারের
লেখা পড়িনি, প্রয়োজনও বোধ করিনি। কবি শওকত ওসমান সাহেব কি লেখেন তাও
জানিনা। আমি শুধু এইটুকু জানি একটি সমাজে নানান ধরনের লোক থাকবে, সেখানে
একজন আরেকজনকে সহ্য করতে হবে। কারো অনুভুতি ও বিশ্বাসকে আঘাত করলে তা
কখনই মঙ্গলকর কিছু বয়ে আনে না। তাছাড়া ইসলাম ধর্ম শুধু শান্তির ধর্মই নয়,
আপন মহিমায় ১৪০০ বছর পার করে সুদূর মক্কা-মদিনা থেকে বিশ্বের কোটি কোটি
মুসলমানদের মনের গভীরে অবস্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশেও আমাদের
পূর্বপুরষরা একসময় ভৌগোলিক সীমারেখা অনুযায়ী হিন্দু এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ
লোকজনই সনাতন ধর্মের অনুসারি থেকেই ইসলাম ধর্মের মহিমায় উজ্জিবীত হয়ে
মুসলমান হয়েছে বলে জেনেছি। তাহলে কেন এই শান্তির ধর্মের মধ্যে আজ এতো
বিদ্বেষ, এতো হানাহানি?

হলি আর্টিজোনের ঘটনা আজও মনকে পীড়া দেয়। ধর্মের নামে, জিহাদের নামে
কতগুলো নিরপরাধ মানুষকে রোযার মধ্যে হত্যা করা হলো। নিশ্চয়ই তারাও কোনো
ধর্মগুরুর হিংসামন্ত্রে উজ্জিবীত হয়েছিল। তারা কি জানেনা সারা বিশ্বের
সংখ্যালঘু মুসলমান ভাইদের উপর ঐ ঘটনার পর কি ঝড়টাই না বয়ে গিয়েছিল? তারা
কি একবারও ভেবেছিল ধর্মের জন্য মানুষ না মানুষের জন্য ধর্ম? তারা কি
জানেনা পবিত্র তায়েফে আমাদের প্রিয় নবীজি জিবরাইল (আঃ) কে কি বলেছিলেন?
তারা কি জানেনা পবিত্র মদিনা সনদে কি ছিল? তারা কি জানেনা মক্কা বিজয়ের
সময় ইসলামের সেনাপতিরা বিধর্মীদের ইঙ্গিত করে কি বলেছিলেন?

পবিত্র জুম্মার দিনে নিউজিল্যান্ডের মসজিদের ঘটনা সারা বিশ্বের
মুসলমানদের মনকে কাঁদিয়েছে, মানবতাকে ভূলুন্ঠিত করেছে। সেখানে শান্তনা
পেলাম নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীসহ সাধারন অমুসলিমদের সাম্য ও
সহমর্মিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখে। কিছুদিন পর আবার শ্রীলংকায়
লোমহর্সকর ভয়াবহ ঘটনা ঘটলো। এভাবে একটির পর একটি পাল্টাপাল্টি ঘটনা ঘটেই
চলেছে সারা বিশ্বে, যার বলিদান হচ্ছে প্রতিনিয়ত নিরপরাধ মানুষ। একটি
রক্তপাত কখনো ভালো কিছু বয়ে আনেনা। তাই অনেক আবেগ তাড়িত হয়ে বিবেকের ডাকে

এই লেখাটি লিখলাম। নিজের আঙ্গিনা থেকেই বন্ধ হোক হিংসার প্রসার। প্রতিটি
মানুষ সোচ্চার হোক আপন আপন যায়গা থেকে। রাষ্ট্র ও প্রশাসন আরো সজাগ হোক
যাতে করে হিংসা আতুর ঘরেই মৃত্যুবরণ করে। যদি আমার আঙ্গিনা তথা আমার দেশ
সংখ্যালঘু অন্য ধর্ম, বর্ণ, মতোবাদের প্রতি সহনশীল থাকে তাহলে আমি বিশ্বাস করি সারা পৃথিবী সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি সংখ্যাগুরু অমুসলিমরাও তাদের ধারনার পরিবর্তন ঘটাবে।

আমার ঐ হিন্দু পূর্বপুরুষটি যার মুসলমান হওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা মুসলমান হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, তাকে যদি কেউ ধর্মীয় হিংসার মন্ত্রে উজ্জিবীত হয়ে হত্যা করে ফেলতো তাহলে আমরা মুসলমান হয়ে জন্মগ্রহণ করতাম কিভাবে? সুতরাং ধর্মীয় হিংসার সমাধি হোক শান্তির ইসলাম আরো দিগন্ত জুড়ে প্রসারিত হোক।